৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে একধরনের সমঝোতা হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিএনপি ও এনসিপি গণভোট চান জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন, আর জামায়াতে ইসলামী চায় নির্বাচনের আগে। দলগুলোর মতে, এই গণভোটের মাধ্যমে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আইনি ভিত্তি তৈরি হবে। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, বর্তমান সংবিধান ও আইনি কাঠামোর মধ্যে এই গণভোট আয়োজন আদৌ সম্ভব কি না।
গণভোট একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে কোনো জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে জনগণ সরাসরি মতামত জানান। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তিনবার গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমটি হয় ১৯৭৭ সালের ৩০ মে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের শাসনকালীন সময়ে। তখন জনগণের আস্থা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে গণভোটের আয়োজন করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮৮ শতাংশ ভোটার অংশ নেন এবং ৯৮ শতাংশের বেশি ভোট পড়ে জিয়ার পক্ষে।
দ্বিতীয় গণভোট অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৫ সালের ২১ মার্চ, সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে। এতে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭২ শতাংশ এবং ৯৪ শতাংশ ভোটার এরশাদের পক্ষে রায় দেন।
তৃতীয় গণভোট হয় ১৯৯১ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর, যখন সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের বিষয়ে জনগণের মত নেওয়া হয়। দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি হন আনুষ্ঠানিক রাষ্ট্রপ্রধান এবং প্রধানমন্ত্রী হন নির্বাহী প্রধান। নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ৮৪ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেন, যার মধ্যে ৮৮ দশমিক ৫ শতাংশ সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে ভোট দেন।
এই তিনটি গণভোটের বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিটি ক্ষেত্রেই সংশ্লিষ্ট বিষয় বা প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছিল। যেমন, জিয়া ও এরশাদ ছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি, আর ১৯৯১ সালের গণভোট হয়েছিল সংসদে পাস হওয়া দ্বাদশ সংশোধনী বিলের অনুমোদনের আগে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ থেকে গণভোটের বিধান বাতিল করা হয়। এর আগে এই অনুচ্ছেদে কিছু নির্দিষ্ট বিষয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য গণভোট বাধ্যতামূলক ছিল। ফলে বর্তমান সংবিধানে গণভোট আয়োজনের কোনো বিধান নেই। প্রশ্ন উঠছে—কোন আইনি কর্তৃত্বে এখন গণভোট আয়োজন করা সম্ভব হবে?
এদিকে, পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের দাবিতে গত বছর সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার একটি রিট দায়ের করেন, যেখানে বিএনপি ও জামায়াতসহ আরও কয়েকটি দল ‘ইন্টারভেনর’ হিসেবে অংশ নেয়। হাইকোর্ট গত ১৭ ডিসেম্বর দেওয়া এক রায়ে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীতে বাদ পড়া ১৪২ অনুচ্ছেদ পুনর্বহালের কথা উল্লেখ করে। যদি এই রায় তাৎক্ষণিকভাবে কার্যকর হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে গণভোট আয়োজন আইনসিদ্ধ হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে সংসদীয় অনুমোদন প্রয়োজন কি না, তা স্পষ্ট নয়।
বাংলাদেশের সাংবিধানিক ইতিহাসে আদালতের রায়ের ভিত্তিতে সংসদীয় সংশোধন আনার নজির আছে। কিন্তু বর্তমানে সংসদ না থাকায় সংবিধান সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। ভবিষ্যৎ সংসদই সে দায়িত্ব নিতে পারবে।
তাছাড়া, হাইকোর্টের রায় এখনো চূড়ান্ত নয়। এর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আপিল ও পরে রিভিউয়ের সুযোগ রয়েছে। ফলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে গণভোট আয়োজন করতে হলে সাংবিধানিক ও আইনি উভয় দিকই নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমান আইনি কাঠামো অনুযায়ী, ‘গণভোট আইন, ১৯৯১’ অনুসারে শুধু সংসদে পাস হওয়া কোনো বিলের ওপরই গণভোট আয়োজন করা যায়। তাই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে গণভোট আয়োজন আইনসম্মত হবে না। প্রয়োজনে অধ্যাদেশের মাধ্যমে এ আইনে সংশোধন আনা যেতে পারে। সেই সঙ্গে হাইকোর্টের রায়ের আলোকে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীকে ভিত্তি হিসেবে নিতে হবে। গণভোটের সিদ্ধান্ত কার্যকর করতে হলে ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২’-এও সংশোধন প্রয়োজন হবে। এসব সংশোধন ছাড়া গণভোট আয়োজন আইনি বৈধতা পাবে না।

















