ঢাকা | ৭ অক্টোবর ২০২৫
বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচিতে ধারাবাহিক অগ্রগতি দেখাচ্ছে। রিজার্ভ বেড়েছে, রেমিট্যান্সে রেকর্ড হয়েছে, এমনকি জ্বালানি ও সার আমদানির বকেয়া পরিশোধেও এসেছে শৃঙ্খলা। কিন্তু এক জায়গাতেই থমকে আছে অগ্রগতি—রাজস্ব আদায়।
অগ্রগতি: রিজার্ভে স্বস্তি, বকেয়া নিষ্পত্তিতে দৃষ্টান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, জুনে রিজার্ভ ছিল ২০.৭৩ বিলিয়ন ডলার—যা আইএমএফের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বেশি। সেপ্টেম্বরে তা ২০ বিলিয়নেরও ওপরে। অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ,
“রেমিট্যান্স এখন বেশি আসছে বৈধ পথে। হুন্ডি কমেছে, আমদানি নিয়ন্ত্রণে আছে, আর টাকার মান স্থিতিশীল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক এখন উল্টো ডলার কিনছে। এটি অর্থবাজারে আস্থার সংকেত।”
একই সঙ্গে, জ্বালানি ও সার খাতে বৈদেশিক বকেয়া জুনে ৮৭০ মিলিয়ন ডলারের সীমা থেকে কমে ৩১৪ মিলিয়নে নেমেছে। অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদের মতে,
“এটি আইএমএফের কাছে একটি শক্ত বার্তা—বাংলাদেশ তার আর্থিক প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে।”
দুর্বল দিক:
রাজস্ব খাতে ‘বাধা পাথর’ তবে রাজস্ব সংগ্রহে ঘাটতি রয়ে গেছে বড় উদ্বেগ হিসেবে। লক্ষ্য ছিল ৪.৪৩ লাখ কোটি টাকা, আদায় হয়েছে ৩.৭৮ লাখ কোটি—অর্থাৎ ঘাটতি প্রায় ৬৫ হাজার কোটি টাকা। কর-জিডিপি অনুপাত এখনো ৮.৫ শতাংশের নিচে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে কম।
একজন এনবিআর কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“গত বছরের রাজনৈতিক অস্থিরতা, এনবিআরের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, এবং আমদানি হ্রাস—সব মিলিয়ে রাজস্ব আদায় বাধাগ্রস্ত হয়েছে।”
আইএমএফ কর্মকর্তারা মনে করছেন, এই ঘাটতি পূরণে সরকারকে কাঠামোগত কর সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে।
আইএমএফের মূল প্রশ্ন কোথায়? অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সূত্র বলছে, আইএমএফ এখন দুটি বিষয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে,
১️. বাংলাদেশ ব্যাংকের ডলার কেনার নীতি আসলেই “বাজার নির্ধারিত বিনিময় হার”–এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না ।
২️. ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল সংক্রান্ত সার্কুলার আর্থিক শৃঙ্খলা ভাঙছে কি না।
ড. জাহিদ হোসেন সতর্ক করেন,
“খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল দিলে পুরোনো অনিয়ম ফিরে আসার ঝুঁকি আছে। আইএমএফ নিশ্চয়ই এই বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা চাইবে।”
কাঠামোগত সংস্কার ও কর প্রশাসনের চাপ সরকার এখন ‘রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ’ নামে একটি নতুন আইন প্রণয়ন করছে। এর আওতায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দুই ভাগে ভাগ হবে রাজস্ব নীতি বিভাগ এবং ব্যবস্থাপনা বিভাগ যা কর সংগ্রহে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা বাড়াবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে আইএমএফ চায় এই কাঠামো ২০২৬ অর্থবছরের শুরুতেই চালু হোক।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন,
“সংস্কার প্রক্রিয়া এখনও প্রাথমিক পর্যায়ে, কিন্তু এটিই আইএমএফকে সন্তুষ্ট করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।”
কূটনৈতিক দৃষ্টিকোণ: আন্তর্জাতিক অংশীদারদের প্রত্যাশা ওয়াশিংটনভিত্তিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বাংলাদেশের এই ঋণ কর্মসূচি কেবল অর্থনৈতিক নয়, ভূরাজনৈতিকভাবেও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষত ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের নজর আছে বাংলাদেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা যদি বজায় থাকে, তা আঞ্চলিক বাণিজ্য ও সরবরাহ চেইনের জন্য ইতিবাচক বার্তা দেবে।
এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন,
“বাংলাদেশের রিজার্ভ ও আমদানি ব্যালান্স এখন স্থিতিশীল। তবে টেকসই রাজস্ব সংস্কার ছাড়া আইএমএফের আস্থা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখা কঠিন হবে।”
কিস্তি আসবে, কিন্তু শর্ত আরও কঠিন ডিসেম্বরে বাংলাদেশের ষষ্ঠ কিস্তি ছাড় হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। কিন্তু রাজস্ব সংস্কার ও ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা নিশ্চিত না হলে, ভবিষ্যতের কিস্তিগুলো আরও কঠিন শর্তে বেঁধে দিতে পারে আইএমএফ।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ শেষ কথায় বলেন,
“বাংলাদেশ এখন প্রমাণের মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে—অগ্রগতি টেকসই হবে কিনা, তা নির্ভর করছে রাজস্ব সংস্কারের গভীরতায়।”

















