নাইজেরিয়ায় সহিংসতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য দেশটির বাস্তব সংকটকে ভুলভাবে উপস্থাপন করছে এবং এতে সাধারণ মানুষের জন্য ভয়াবহ পরিণতির আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে বলে বিশ্লেষকেরা সতর্ক করেছেন।
নভেম্বরের শুরুতে ট্রাম্প দাবি করেন, নাইজেরিয়ায় খ্রিস্টধর্ম ‘অস্তিত্ব সংকটে’ রয়েছে এবং সেখানে তথাকথিত উগ্র ইসলামপন্থীরা গণহত্যা চালাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া একাধিক পোস্টে তিনি ইঙ্গিত দেন, প্রয়োজনে যুক্তরাষ্ট্র সামরিক শক্তি ব্যবহার করে নাইজেরিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারে। এই বক্তব্যের মাধ্যমে দেশটির জটিল নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে বলে সমালোচনা উঠেছে।
তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন। নভেম্বরের মাঝামাঝি উত্তর নাইজেরিয়ায় একাধিক স্কুলে হামলা ও অপহরণের ঘটনা ঘটে। কেব্বি রাজ্যের একটি সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে হামলায় এক শিক্ষক নিহত হন এবং মুসলিম ছাত্রীদের অপহরণ করা হয়। কয়েক দিনের মধ্যেই নাইজার রাজ্যের একটি ক্যাথলিক স্কুলেও শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের অপহরণ করা হয়। এসব ঘটনায় দেখা গেছে, হামলার শিকার হচ্ছে মুসলিম ও খ্রিস্টান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব সহিংসতা ধর্মীয় নিপীড়নের চেয়ে বেশি সংগঠিত অপরাধ, মুক্তিপণ আদায় এবং রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার ফল। উত্তর নাইজেরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চলে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো সুযোগ বুঝে স্কুল, গ্রাম ও সড়কে হামলা চালাচ্ছে। এসব হামলার পেছনে মূল উদ্দেশ্য অর্থনৈতিক লাভ, ধর্মীয় মতাদর্শ নয়।
নাইজেরিয়ার ক্যাথলিক চার্চের প্রভাবশালী নেতা বিশপ ম্যাথিউ কুকাহসহ বহু ধর্মীয় ও নাগরিক নেতা ট্রাম্পের বক্তব্য প্রত্যাখ্যান করেছেন। তাঁদের মতে, সহিংসতাকে ধর্মীয় যুদ্ধ হিসেবে দেখালে প্রকৃত সমস্যাগুলো আড়াল হয়ে যায় এবং সমাধানের পথ আরও জটিল হয়ে ওঠে।
মানবাধিকার সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের মে মাসের পর থেকে দেশটিতে সশস্ত্র হামলায় ১০ হাজারের বেশি বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে। শত শত গ্রাম পরিত্যক্ত হয়েছে এবং হাজারো শিশু শিক্ষার সুযোগ হারিয়েছে। অনেক এলাকায় অপহরণ এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে এবং রাজধানী আবুজার আশপাশের সড়কেও এর প্রভাব পড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটকে ধর্মীয় সংঘাত হিসেবে চিহ্নিত করা বিপজ্জনক। এতে বিদেশি সামরিক হস্তক্ষেপকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে, যা অতীতে ইরাক ও লিবিয়ার মতো দেশে ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে এনেছে। নাইজেরিয়ায় বিদেশি সেনা মোতায়েন হলে পরিস্থিতি আরও সহিংস হয়ে উঠতে পারে এবং সাধারণ মানুষ দুই পক্ষের মাঝখানে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
নাইজেরিয়ার সমস্যার শিকড় বহু পুরোনো। দারিদ্র্য, বেকারত্ব, দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ও সীমিত রাষ্ট্রীয় উপস্থিতি অপরাধী চক্রগুলোর বিস্তারে সহায়তা করেছে। গ্রামীণ অঞ্চলে ব্যাপক দারিদ্র্য ও তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব সহিংসতার ঝুঁকি বাড়িয়েছে।
সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট বোলা তিনুবু নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছেন। পুলিশ সদস্য নিয়োগ, বনাঞ্চলে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানো এবং গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে বিশ্লেষকেরা বলছেন, এসব উদ্যোগ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি।
নাইজেরিয়ার জন্য বিদেশি হুমকি বা সামরিক হস্তক্ষেপ নয়, বরং প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়ানো। যুক্তরাষ্ট্রসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত দেশটির সার্বভৌমত্ব সম্মান করে সহায়তা দেওয়া, যাতে নাইজেরিয়া নিজস্ব সক্ষমতায় নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে।
বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, নাইজেরিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে বিদেশি আগ্রাসন নয়, বরং দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও প্রতিষ্ঠানগুলো নাগরিক সুরক্ষাকে কতটা অগ্রাধিকার দেয় তার ওপর।
















