অবৈধ পথে অর্থ খরচ না করে দেশে বিনিয়োগের আহ্বান ইতালির দূতের
ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো বলেছেন, বৈধ পথ বাদ দিয়ে দালালকে লাখ লাখ টাকা দিয়ে যারা সমুদ্রপথে ইউরোপের পথ ধরে, তারা কেবল ‘ভুক্তভোগী’ নয়, বরং নিজেদের ভবিতব্যের জন্য দায়ী। ১৫ হাজার ইউরো (প্রায় ২১ লাখ টাকা) অবৈধ পথে খরচ না করে তা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ দেন তিনি। রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা বজায় রাখার গুরুত্ব তুলে ধরেন এবং ভুয়া সরকারি কাগজপত্রের বিষয়টিও উত্থাপন করেন।
প্রকাশ: ১১ নভেম্বর ২০২৫,
ঢাকা: অবৈধ উপায়ে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রপথে ইতালিগামী বাংলাদেশিদের কঠোর বার্তা দিলেন ঢাকায় নিযুক্ত ইতালির রাষ্ট্রদূত আন্তোনিও আলেসান্দ্রো। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, দালালদের লাখ লাখ টাকা দিয়ে অবৈধ পথে ইউরোপের পথে পা বাড়ালে তারা কেবল ‘ভুক্তভোগী’ নন, বরং নিজেদের ভবিতব্যের জন্য দায়ীও।
সোমবার বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) আয়োজিত ‘সম্পর্ক শক্তিশালীকরণ: বাংলাদেশ ও ইতালির মধ্যে ভবিষ্যতের খোঁজ’ শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি মূল বক্তব্য প্রদান করেন।
দায়িত্বের বার্তা: ‘কেবল ভুক্তভোগী নন’
গণমাধ্যমে অবৈধ অভিবাসীদের ‘ভুক্তভোগী’ হিসেবে আখ্যায়িত করার সমালোচনা করে রাষ্ট্রদূত আলেসান্দ্রো বলেন, “আমি গণমাধ্যমে দেখেছি, আপনারা এসব মানুষদের জন্য ভুক্তভোগী শব্দটা ব্যবহার করেন। নিশ্চিতভাবে তারা ভুক্তভোগী হয়েছে—লিবিয়া, নির্যাতন, সমুদ্রপথে যাত্রা এবং কেউ কেউ মারা যাওয়ার মতো বাজে অভিজ্ঞতার পর। কিন্তু শুরুতে যখন তারা অবৈধ দালালকে কাণ্ডজ্ঞানহীনভাবে অর্থ দিয়েছে, তখন তারা ভুক্তভোগী নয়, নিজেদের ভবিতব্যের জন্য দায়ী।”
তিনি যোগ করেন, “সুতরাং আমাদেরকে এই বার্তা দিতে হবে, ‘আপনি কেবল ভুক্তভোগী নন, আপনি যেটা করছেন, তার জন্য দায়ী হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন’।”
বিদেশে অবৈধ পথে ২১ লাখ টাকা, দেশে উদ্যোক্তা হওয়ার পরামর্শ
অবৈধপথে ইতালি যেতে ১৫ হাজার ইউরো (প্রায় ২১ লাখ টাকা) পর্যন্ত খরচ করার খবর তুলে ধরে রাষ্ট্রদূত পরামর্শ দেন, এই বিপুল অর্থ বিদেশে যাওয়ার অবৈধ পথে খরচ না করে বরং বাংলাদেশে বিনিয়োগ করা উচিত।
রাষ্ট্রদূত বলেন,
“ইতালি বা অন্য কোনো দেশে অবৈধপথে যাওয়ার চেয়ে আপনারা এই অর্থ বাংলাদেশে উদ্যোক্তা হতে এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে খরচ করুন… আপনি এই ১৫ হাজার ইউরো দিয়ে বাংলাদেশের যে গ্রামে থাকেন, সেখানে ভালো কিছু করতে পারবেন। দোকান বা এ ধরনের অর্থনৈতিক উদ্যোগে খরচ বা অন্য কোনো বিনিয়োগ করে আপনি বাংলাদেশে ভালো জীবনযাপন করতে পারবেন।”
ভুয়া কাগজপত্র এবং দেশের সুনাম
আলোচনা সভায় ইতালির রাষ্ট্রদূত বাংলাদেশের সরকারি কাগজপত্রের ‘ভুয়া’ প্রমাণিত হওয়ার পুরনো অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন,
“যখন কোনো বিদেশি বিনিয়োগকারী আসেন, তার প্রত্যাশা থাকে যে, কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা কাগজপত্র সঠিক হবে। তাকে এটা সত্য না মিথ্যা, সে বিষয়ে দুশ্চিন্তা করতে হবে না।”
তিনি জানান, কনস্যুলার অফিসে অনেক বিবাহ সনদ, জন্ম সনদ, তালাকের সনদ আসে, যা যথাযথ কর্তৃপক্ষ ইস্যু করলেও ভেতরের তথ্য মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়। ভুয়া কাগজপত্র দেশের ‘সুনামের জন্য ভালো নয়’ বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
স্থিতিশীলতা প্রয়োজন ইতালির স্বার্থেই
রাষ্ট্রদূত আলেসান্দ্রো জানান, কেবল ২০২৫ সালেই ১৭ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশ থেকে ইতালির উপকূলে গেছেন, যা বৈশ্বিকভাবে সর্বোচ্চ। বর্তমানে সংখ্যাটি ১৮ হাজারের বেশি এবং প্রতিদিন এই স্রোত অব্যাহত রয়েছে।
তিনি বলেন, “তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করছেন। তারা রাজনৈতিক আশ্রয়ের যোগ্য নন, তবুও আবেদন করছেন। কেননা এটাই থাকার একমাত্র উপায়।”
অবশেষে তিনি বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধির ওপর জোর দিয়ে বলেন, “অবশ্যই আমরা বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা ও সমৃদ্ধি নিয়ে ভাবি। কেননা যদি এই দেশ ব্যর্থ হয়, তাহলে আপনি ভাবতে পারেন কত লোক এই পথ ধরবে?” তিনি পালাবদল, আধুনিকায়ন এবং সংস্কারে বাংলাদেশের প্রশংসনীয় উদ্যোগগুলোকে সমর্থন জানানোর কথা পুনর্ব্যক্ত করেন।
অনুষ্ঠানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক সৈয়দা রোজানা রশিদ এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ইউরোপের দুই অনুবিভাগের মহাপরিচালক মোশাররফ হোসেন প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সভা সঞ্চালনা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের অধ্যাপক কাজী মারুফুল ইসলাম।
















