ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাত একবারের জন্য থেমে গেলেও বিশ্ব অর্থনীতির সামনে জ্বালানি সংকটের ঝুঁকি কাটবে না বলে মত দিয়েছেন পরিবেশ ও জ্বালানি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বিশ্বের অর্থনীতিকে বারবার অস্থিতিশীল করে তুলছে। তাই দীর্ঘমেয়াদে নবায়নযোগ্য ও স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোই হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর সমাধান।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাতের ফলে মধ্যপ্রাচ্যে অনিশ্চয়তা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় এবং নিত্যপণ্যের মূল্যও বেড়েছে। বিশেষ করে যেসব দেশ আমদানি করা তেল ও গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল, সেগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে।
পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথে অস্থিরতার কারণে জ্বালানির ব্যয় বেড়ে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হয়েছে। একইভাবে আফ্রিকা, লাতিন আমেরিকা এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও জ্বালানি ব্যয় বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচ বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিতে আন্তর্জাতিক অস্থিরতার প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত সৌর, বায়ু ও অন্যান্য নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার যত বাড়বে, ততই বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব থেকে একটি দেশ নিজেকে সুরক্ষিত রাখতে পারবে।
আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলোও সতর্ক করেছে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার কারণে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া এবং খাদ্য নিরাপত্তা সংকট আরও গভীর হতে পারে। ইতোমধ্যে বহু দেশ জ্বালানির বাড়তি দামের প্রভাব মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, যুদ্ধ বা ভূরাজনৈতিক সংকটের সময় বড় জ্বালানি কোম্পানিগুলো বিপুল মুনাফা অর্জন করে। একই সঙ্গে নতুন তেল ও গ্যাস উত্তোলন, পাইপলাইন নির্মাণ এবং পরিবেশগত বিধিনিষেধ শিথিলের দাবিও জোরালো হয়ে ওঠে। ফলে সংকটের মূল কারণ দূর হওয়ার পরিবর্তে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা আরও বাড়ে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান সংঘাত শেষ হলেও ভবিষ্যতে অন্য কোনো যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা সরবরাহ সংকট আবারও একই ধরনের অর্থনৈতিক ধাক্কা তৈরি করতে পারে। তাই কেবল যুদ্ধবিরতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
তাদের মতে, বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বিদ্যুৎ সঞ্চয় প্রযুক্তি, বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন এবং জ্বালানি সাশ্রয়ী অবকাঠামো গড়ে তুললে আন্তর্জাতিক সংকটের প্রভাব অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে। এতে দেশগুলো আরও স্বনির্ভর ও স্থিতিশীল জ্বালানি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে।
ইরানকে কেন্দ্র করে সাম্প্রতিক সংঘাত আবারও প্রমাণ করেছে, জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর বিশ্ব অর্থনীতি কেবল যুদ্ধ নয়, সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়ও বাড়িয়ে তোলে। তাই ভবিষ্যতের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসারকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন বিশ্লেষকরা।
















