যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে আবারও সামরিক উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ায় দুই দেশকে আলোচনার টেবিলে ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে পাকিস্তানের মধ্যস্থতা কতটা কার্যকর হতে পারে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইসলামাবাদ এখনো কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিচ্ছে, তবে বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার মতো বাস্তব প্রভাব বা চাপ প্রয়োগের সক্ষমতা পাকিস্তানের সীমিত।
গত ১৭ জুন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক (MoU) স্বাক্ষরিত হয়েছিল, যার লক্ষ্য ছিল যুদ্ধবিরতি দীর্ঘায়িত করে স্থায়ী শান্তির পথে এগোনো। কিন্তু এক মাসেরও কম সময়ের মধ্যে নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ায় সেই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে।
সাম্প্রতিক কয়েক দিনে যুক্তরাষ্ট্র ইরানে ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে। জবাবে ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে, যেখানে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে বলে তারা দাবি করে, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এর মধ্যে কাতারেও হামলার ঘটনা ঘটে, যেখানে ধ্বংসাবশেষ পড়ে অন্তত তিনজন আহত হন।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ানের সঙ্গে কথা বলে শান্তি প্রচেষ্টাকে রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন। উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার পৃথকভাবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে সংলাপকেই একমাত্র কার্যকর পথ হিসেবে তুলে ধরেছেন।
তবে তেহরানভিত্তিক গবেষক জাভাদ হেইরান-নিয়ার মতে, জুনের সমঝোতা মূল বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য নয়, বরং সাময়িকভাবে সংঘাত থামানো এবং হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখার কৌশল ছিল। তার ভাষ্য, ইরান হরমুজ প্রণালিকে কেবল চাপ প্রয়োগের উপায় নয়, বরং কৌশলগত প্রতিরোধের অংশ হিসেবে দেখে এবং এ অবস্থান রক্ষায় সংঘাতের ঝুঁকিও নিতে প্রস্তুত।
দোহাভিত্তিক Gulf International Forum-এর নির্বাহী পরিচালক দানিয়া থাফের মনে করেন, ওয়াশিংটন ও তেহরান উভয়ই এখন সামরিকভাবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করার পর্যায়ে রয়েছে। তাই কোনো মধ্যস্থতাকারীর পক্ষেই তাৎক্ষণিকভাবে উত্তেজনা কমানো কঠিন। তার মতে, যখন কোনো এক পক্ষ কৌশলগতভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছাবে, তখনই নতুন করে আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে।
অন্যদিকে ইসলামাবাদভিত্তিক সানোবার ইনস্টিটিউটের প্রধান কামার চিমা মনে করেন, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো দুই পক্ষের আস্থা। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান—উভয় দেশই প্রয়োজন হলে পাকিস্তানের নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে। এই বিশ্বাসযোগ্যতাই ইসলামাবাদের সবচেয়ে কার্যকর কূটনৈতিক সম্পদ।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়েই মূল বিরোধ এখনো অমীমাংসিত। ইরান দাবি করছে, সমঝোতা অনুযায়ী ওই জলপথে চলাচলের বিষয়ে তাদের কর্তৃত্ব রয়েছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তা মানতে রাজি নয়। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ইরানি জাহাজের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহাল এবং অন্যান্য জাহাজের ওপর ২০ শতাংশ ট্রানজিট ফি আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন।
তবে কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি বলেও মত রয়েছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, উভয় পক্ষ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জুনের সমঝোতা বাতিল করেনি। ফলে সংঘাত চললেও আলোচনার সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। শেষ পর্যন্ত হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে কে কতটা ছাড় দেয় এবং সামরিক চাপের ভারসাম্য কোন দিকে যায়, তার ওপরই ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি নির্ভর করবে।
















