ভারতের গবেষকরা মানুষের মস্তিষ্কের অন্যতম জটিল অংশ ‘ব্রেইনস্টেম’-এর বিশ্বের সবচেয়ে বিস্তারিত ত্রিমাত্রিক (৩ডি) ডিজিটাল মানচিত্র তৈরির দাবি করেছেন। বিজ্ঞানীদের মতে, এই অগ্রগতি ভবিষ্যতে আলঝেইমার, পারকিনসনস, স্ট্রোক এবং অন্যান্য স্নায়বিক রোগের গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করতে পারে।
ভারতের চেন্নাইয়ে অবস্থিত ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি-মাদ্রাজের (IIT-M) সুধা গোপালকৃষ্ণন ব্রেইন সেন্টারের (SGBC) গবেষকরা ‘অ্যাঙ্কর’ (ANCHOR – Atlas of Neurochemical Characterisation of the Human Brainstem with 3D Reconstruction) নামে এই ডিজিটাল অ্যাটলাস তৈরি করেছেন। এতে ভ্রূণ, শিশু ও প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের মস্তিষ্কের ৫০০টিরও বেশি টিস্যু নমুনা ব্যবহার করে উচ্চ-রেজোলিউশনের মাইক্রোস্কোপিক চিত্রের মাধ্যমে ব্রেইনস্টেমের ত্রিমাত্রিক গঠন পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে।
গবেষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, এই অ্যাটলাসে ২০০টিরও বেশি স্নায়ুকোষের গুচ্ছ (সেল ক্লাস্টার) এবং স্নায়ুপথ শনাক্ত করা হয়েছে। আট ধরনের রাসায়নিক চিহ্ন ব্যবহার করে বিভিন্ন কোষ আলাদা করা সম্ভব হয়েছে, যা ব্রেইনস্টেমের এখন পর্যন্ত অন্যতম স্পষ্ট ও বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরে।
মস্তিষ্কের ব্রেইনস্টেম আকারে ছোট হলেও এটি শ্বাস-প্রশ্বাস, হৃদস্পন্দন, ঘুম, জাগরণ, চলাচল এবং মস্তিষ্কের সঙ্গে মেরুদণ্ডের যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করে। এই অংশের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কোষের ক্ষতিও প্রাণঘাতী হতে পারে। কিন্তু এর ঘন ও জটিল গঠনের কারণে এতদিন এটি বিস্তারিতভাবে মানচিত্রায়ন করা সম্ভব হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন অ্যাটলাসটির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এটি এমআরআই স্ক্যানে দেখা পুরো মস্তিষ্কের গঠন এবং মাইক্রোস্কোপে দেখা একক স্নায়ুকোষের তথ্যকে একই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করেছে। ফলে গবেষকরা পুরো মস্তিষ্ক থেকে শুরু করে পৃথক নিউরন পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারবেন।
গবেষণাটি উন্মুক্তভাবে অনলাইনে প্রকাশ করা হয়েছে, যাতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্নায়ুবিজ্ঞানী, নিউরোসার্জন এবং চিকিৎসা গবেষকরা এটি ব্যবহার করতে পারেন। এটি সরাসরি রোগ নির্ণয়ের প্রযুক্তি নয়, তবে সুস্থ ও রোগাক্রান্ত মস্তিষ্কের তুলনামূলক বিশ্লেষণের মাধ্যমে আলঝেইমার, পারকিনসনস, স্ট্রোক, অটিজম, সাডেন ইনফ্যান্ট ডেথ সিনড্রোম (SIDS) এবং কোভিড-পরবর্তী স্নায়বিক জটিলতা সম্পর্কে আরও গভীর ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
গবেষণা দলের পরবর্তী লক্ষ্য হলো বিভিন্ন বয়স ও স্নায়বিক রোগে আক্রান্ত মানুষের ১০০টিরও বেশি সম্পূর্ণ মস্তিষ্কের ত্রিমাত্রিক মানচিত্র তৈরি করা। এতে বিজ্ঞানীরা কোষভিত্তিক পর্যায়ে বুঝতে পারবেন কীভাবে বিভিন্ন রোগ মানুষের মস্তিষ্ককে পরিবর্তিত করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কের সব রহস্য এখনই উন্মোচিত না হলেও এই নতুন অ্যাটলাস ভবিষ্যতের স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছে এবং জটিল মস্তিষ্কজনিত রোগ সম্পর্কে নতুন প্রশ্ন ও নতুন উত্তর খুঁজে পাওয়ার পথ আরও সহজ করবে।
















