গণহত্যা, যুদ্ধাপরাধ, জাতিগত নির্মূল এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ প্রতিরোধে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব নিয়ে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে পূর্ণাঙ্গ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়েছে। তবে বৈঠকটি এমন এক সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গুরুতর মানবিক সংকট অব্যাহত রয়েছে এবং সমালোচকদের মতে, বহু ক্ষেত্রেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
জাতিসংঘের ১৯৪৮ সালের গণহত্যা প্রতিরোধ ও শাস্তি বিষয়ক কনভেনশন অনুযায়ী, কোনো জাতীয়, জাতিগত, বর্ণগত বা ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত কর্মকাণ্ডকে গণহত্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—গোষ্ঠীর সদস্যদের হত্যা, গুরুতর শারীরিক বা মানসিক ক্ষতি করা, এমন জীবনযাত্রার পরিবেশ সৃষ্টি করা যাতে গোষ্ঠীটি ধ্বংস হয়ে যায়, জন্ম রোধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং শিশুদের জোরপূর্বক অন্য গোষ্ঠীতে স্থানান্তর।
বিশ্লেষকদের মতে, ইতিহাসে একাধিক ঘটনায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং জাতিসংঘ সময়মতো হস্তক্ষেপ করতে পারেনি। ১৯৯৪ সালে রুয়ান্ডায় প্রায় আট লাখ তুতসি ও মধ্যপন্থী হুতু নিহত হন। পরবর্তীতে জাতিসংঘ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন করলেও গণহত্যা প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য সংস্থাটি প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ করে।
বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার স্রেব্রেনিৎসায় ১৯৯৫ সালে আট হাজারের বেশি বসনিয়াক পুরুষ ও কিশোর নিহত হওয়ার ঘটনাকেও পরবর্তীতে আন্তর্জাতিক আদালত গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। তবে এ স্বীকৃতি এবং জাতিসংঘের আনুষ্ঠানিক স্মরণ দিবস ঘোষণার মধ্যে প্রায় তিন দশকের ব্যবধান ছিল।
সুদানের দারফুর অঞ্চলেও চলমান সংঘাতে জাতিসংঘের বিভিন্ন তদন্তে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘন ও সম্ভাব্য গণহত্যার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। একইভাবে এল-ওবেইদ শহর ঘিরেও মানবিক বিপর্যয়ের সতর্কবার্তা দিয়েছে জাতিসংঘ।
চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলে উইঘুর মুসলিমদের ব্যাপারে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর ২০২২ সালে জানায়, সেখানে সংঘটিত কর্মকাণ্ড মানবতাবিরোধী অপরাধের পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। যদিও চীন এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ দমনের জন্যই এসব পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে। ২০১৭ সালে সামরিক অভিযানের পর প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (ICJ) মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগে মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
এদিকে গাজা যুদ্ধ নিয়েও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন জাতিসংঘ বিশেষজ্ঞ, তদন্ত কমিশন এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড নিয়ে গুরুতর অভিযোগ তুলেছে এবং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের আশঙ্কা প্রকাশ করেছে। অন্যদিকে ইসরায়েল এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, তারা আত্মরক্ষার অধিকার প্রয়োগ করছে এবং হামাসের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করছে।
বিশ্লেষকদের মতে, জাতিসংঘের বর্তমান বৈঠক ভবিষ্যতে গণহত্যা প্রতিরোধে নতুন নীতিমালা বা সুপারিশ প্রণয়নে সহায়ক হতে পারে। তবে অতীতের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ অনেক সময় সদস্য রাষ্ট্রগুলোর রাজনৈতিক অবস্থান, নিরাপত্তা পরিষদের ভেটো ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক ঐকমত্যের ওপর নির্ভর করে। ফলে কেবল নীতিগত ঘোষণা নয়, দ্রুত ও সমন্বিত আন্তর্জাতিক উদ্যোগই ভবিষ্যতে মানবিক বিপর্যয় প্রতিরোধের প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে।
















