বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ধরনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে এমন এক শক্তিশালী এল নিনো পরিস্থিতির বিষয়ে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ। বিজ্ঞানীরা আশঙ্কা করছেন, এল নিনো এবং মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
জাতিসংঘের বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এল নিনোর নতুন পর্যায় শুরু হতে পারে। সংস্থাটির মতে, চলতি বছরের বাকি সময়জুড়ে এটি আরও শক্তিশালী হতে পারে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও চরম আবহাওয়ার ঘটনা বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিভিন্ন দেশের আবহাওয়া সংস্থার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, এটি কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোগুলোর একটি হতে পারে। কিছু বিশেষজ্ঞ একে ‘সুপার এল নিনো’ হওয়ার সম্ভাবনাও দেখছেন।
বিশেষজ্ঞরা জানান, প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। কয়েক মাস আগেও ওই অঞ্চলের পানি স্বাভাবিকের তুলনায় শীতল ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে তাপমাত্রা ধারাবাহিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং উষ্ণ পানির বিস্তার আরও স্পষ্ট হয়েছে।
এল নিনো সৃষ্টি হয় যখন বায়ুপ্রবাহের স্বাভাবিক ধরণ পরিবর্তিত হয়ে উষ্ণ সমুদ্রের পানি পূর্ব দিকে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায় এবং তা বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ওপর প্রভাব ফেলে।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, সমুদ্রের গভীরে অস্বাভাবিক উষ্ণ পানির বিশাল স্তর তৈরি হয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। এই উষ্ণ পানি ধীরে ধীরে পৃষ্ঠে উঠে এসে বায়ুমণ্ডলকে আরও উষ্ণ করতে পারে।
জাতিসংঘ মহাসচিব বলেছেন, উষ্ণায়নের কারণে ইতোমধ্যেই চাপের মধ্যে থাকা পৃথিবীতে এল নিনো যেন আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করবে। এর প্রভাব আরও দ্রুত, আরও বিস্তৃত এবং আরও বিধ্বংসী হতে পারে।
সাধারণত শক্তিশালী এল নিনোর কারণে দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ার কিছু অঞ্চলে খরা ও দাবানলের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে ভারতীয় মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল হতে পারে এবং আফ্রিকার কিছু অংশে শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। অন্যদিকে কিছু অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার আশঙ্কা বাড়ে।
অতীতের শক্তিশালী এল নিনো বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়েছে। ফসল উৎপাদন কমে যাওয়া এবং বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার ফলে শত শত বিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতির নজির রয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবারের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক, কারণ মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ইতোমধ্যেই রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছেছে। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হলে বৈশ্বিক উষ্ণতা নতুন রেকর্ড গড়তে পারে।
জলবায়ুবিজ্ঞানীদের ধারণা, আগামী বছর বিশ্বব্যাপী তাপমাত্রা ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। তাদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতি স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে যে মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তন পৃথিবীর আবহাওয়াকে কতটা গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।
















