এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর জন্য দু’টি টিকা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। তবে, সেগুলো ব্যবহারেও রয়েছে নানা সীমাবদ্ধতা। আর এ কারণেই বিশ্বের অনেক দেশ ডেঙ্গু টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দিলেও বাংলাদেশ এখনো এ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়নি।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় টিকা: কেন বাংলাদেশে এখনো ব্যবহারের অনুমোদন নেই?
ঢাকা, ৮ নভেম্বর ২০২৫: ডেঙ্গুজ্বর এখন আর বর্ষাকালীন রোগ নয়; বছরজুড়ে এর প্রাদুর্ভাব এবং আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় তা মানুষের মধ্যে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কীটতত্ত্ববিদরা জলবায়ু পরিবর্তন ও অপরিকল্পিত নগরায়ণকে এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন। পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকার ব্যবহার অপরিহার্য হলেও, ডেঙ্গুর কার্যকর ও সার্বজনীন টিকার সীমাবদ্ধতা থাকায় বাংলাদেশ এখনো কোনো টিকা ব্যবহারের অনুমোদন দেয়নি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদিত দুটি টিকা
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোশতাক হোসেন জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুর জন্য বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) দু’টি টিকা ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে:
| টিকার নাম | প্রস্তুতকারক | WHO অনুমোদন | টিকার সীমাবদ্ধতা |
| ডেঙ্গাভেক্সিয়া (Dengvaxia) | সানোফি-অ্যাভেন্টিজ (ফ্রান্স) | বেশ কয়েকটি দেশ অনুমোদন দিয়েছে। | এই টিকা শুধুমাত্র একবার ডেঙ্গু হওয়া ব্যক্তিকে দেওয়া যায়। যার জীবনে কখনো ডেঙ্গু হয়নি, তাকে দেওয়া যাবে না। |
| কিউডেঙ্গা (Qdenga) | তাকেদা ফার্মাসিউটিক্যালস (জাপান) | ২০২৩ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা অনুমোদন দেয়। | এটি শুধুমাত্র ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সীদের জন্য অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। |
বাংলাদেশে টিকা ব্যবহার না হওয়ার কারণ
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও কীটতত্ত্ববিদরা বাংলাদেশে ডেঙ্গু টিকা ব্যবহারের অনুমোদন না দেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে এই দুটি টিকার নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধতা ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কথা উল্লেখ করেছেন।
- সীমিত বয়সসীমা: কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘ডেঙ্গুর ভ্যাকসিনের কিছু লিমিটেশনস আছে, একটা নির্দিষ্ট বয়সের মানুষকে ছাড়া দেওয়া যায় না, ১৬ বছরের নিচে বয়স হতে হয়।’
- পূর্ব ডেঙ্গু সংক্রমণের বাধ্যবাধকতা: ডেঙ্গাভেক্সিয়া দেওয়ার ক্ষেত্রে আগে একবার ডেঙ্গু হওয়ার শর্ত থাকায় এর ব্যবহার সার্বজনীন করা কঠিন।
এছাড়াও অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, টিকার অনুমোদন দিতে হলে আগে এই রোগকে এপিডেমিক (মহামারি) হিসেবে ডিক্লেয়ার করতে হবে, যা জনমনে আরও আতঙ্ক বাড়াতে পারে।
বাংলাদেশে টিকার ট্রায়াল
বাংলাদেশে ডেঙ্গু টিকা ব্যবহারের অনুমোদন না থাকলেও, ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র (আইসিডিডিআরবি) যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান, ভার্মন্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের লার্নার কলেজ অব মেডিসিন ও ইউএস ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অব হেলথ (এনআইএইচ) এর আবিষ্কার করা ‘টিভি০০৫’ টিকার দ্বিতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল পরিচালনা করেছিল। তবে এই ট্রায়াল নিয়ে পরে আর আলোচনা এগোয়নি বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ: এখন সচেতনতাই প্রধান হাতিয়ার
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক মোশতাক হোসেনের মতে, ‘ধারাবাহিকভাবে ডেঙ্গু যে পর্যায়ে যাচ্ছে এবং এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে খুব একটা সফলতাও আমরা দেখাতে পারছি না, তাতে ভ্যাকসিন আনা যায় কি না, এটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনার সময় এসেছে।’
তবে অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলছেন, ডেঙ্গু টিকা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নিতে সরকারি সিদ্ধান্ত, বিশেষজ্ঞ মতামত ও ট্রায়ালসহ নানা বিষয় জড়িত। এই প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। তার মতে, বর্তমানে টিকার চেয়ে মানুষের সচেতনতা অনেক বেশি জরুরি। পরিচ্ছন্ন থাকা, পানি জমতে না দেওয়া এবং মশারি টাঙানোর মতো পদক্ষেপগুলোই ডেঙ্গুর প্রকোপ কমিয়ে আনার জন্য সবচেয়ে কার্যকর।
















