শ্রীনগর, ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের প্রভাতটা ছিল ক্রিকেটের স্বপ্নে ভরা। আনন্তনাগের তরুণ ক্রিকেটার আসিফ মানজুর সেদিন প্রস্তুত হচ্ছিলেন জীবনের এক অবিস্মরণীয় ম্যাচে নামার জন্য। আন্তর্জাতিক তারকা, স্থানীয় প্রতিভা, আর হাজারো প্রত্যাশার ভিড়ে শুরু হয়েছিল ইন্ডিয়ান হেভেন প্রিমিয়ার লিগ—এক উৎসব, এক প্রতিশ্রুতি, এক অলৌকিক আশার কাহিনি।
কিন্তু হঠাৎই সব কিছু ভেঙে পড়ল কাচের মতো। রেডিসন হোটেলের করিডরে দাঁড়িয়ে আসিফ বুঝলেন, খেলার মাঠ নয়, আজ তাদের লড়াই বেঁচে থাকার। আয়োজকেরা উধাও, বিলের পাহাড় জমেছে, খেলোয়াড়রা বন্দি হয়ে পড়েছেন পাঁচতারা হোটেলে। স্বপ্নের বদলে এল হতাশা, চিৎকার, আর প্রতারণার ছায়া।
আয়োজক সংস্থা যুবা সোসাইটি, পাঞ্জাবভিত্তিক এক সংগঠন, তাদের হাতেই ছিল পুরো আয়োজনের দায়িত্ব। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল কাশ্মীরের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ক্রিকেট উৎসবের। কিন্তু টুর্নামেন্টের মাঝপথে অর্থ ফুরিয়ে গেলে তারা অদৃশ্য হয়ে যায়, রেখে যায় অবিশ্বাসের ধোঁয়া।
আসিফ বললেন, “আমরা ভাবছিলাম সকালেই খেলায় নামব। কিন্তু বিকেলে বুঝলাম, আমরা আসলে বন্দি।” হোটেল বিল ছাড়াতে তাদের সহায়তা করেন ইংল্যান্ড ক্রিকেট বোর্ডের এক কর্মকর্তা, যিনি ব্রিটিশ হাই কমিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। অবশেষে তারা মুক্তি পান, কিন্তু টুর্নামেন্ট তখন মৃত—ফ্যানকোড অ্যাপে ম্যাচগুলোর পাশে লেখা ‘abandoned’।
এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে কাশ্মীর প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে। কেন আগেভাগে যাচাই করা হলো না আয়োজকদের পটভূমি? এমন সংবেদনশীল অঞ্চলে কীভাবে অনুমতি মিলল এমন এক বিশাল আয়োজনের? এখন তদন্ত শুরু হয়েছে, আর প্রশাসন নিজেদের দায় এড়িয়ে বলছে—“আইন তার নিজের পথে চলবে।”
টুর্নামেন্টে অংশ নিয়েছিলেন বিশ্বের তারকা খেলোয়াড়েরা—ক্রিস গেইল, থিসারা পেরেরা, জেসি রাইডার, রিচার্ড লেভি—সবাই ছিলেন এই চমকপ্রদ মঞ্চের অংশ। স্থানীয় খেলোয়াড়দের সঙ্গে একসঙ্গে খেলার যে আনন্দের প্রতিশ্রুতি, তা শেষমেশ পরিণত হলো গভীর হতাশায়।
কাশ্মীরের জনপ্রিয় ক্রিকেটার পারভেজ রসুল বললেন, “এই আয়োজনটা আমাদের জন্য ছিল স্বপ্ন। কিন্তু মনে হচ্ছে পরিকল্পনাই ছিল না ঠিকঠাক। দর্শকও আসেনি, আর স্পনসররা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।”
অনেকের মতে, ক্রিকেটের এই নাটক আসলে রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়। মোদি সরকারের তথাকথিত ‘স্বাভাবিক কাশ্মীর’ দেখানোর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে এমন আয়োজনের আয়োজন করা হয়, যেখানে বাস্তবতার ছায়া ঢাকা পড়ে রঙিন আলোর নিচে। কিন্তু যখন আয়োজকেরা পালিয়ে গেল, তখন উন্মোচিত হলো কাশ্মীরের চিরচেনা বাস্তবতা—অবিশ্বাস, অস্থিরতা, আর অবদমন।
একজন কাশ্মীরি তরুণ বললেন, “তারা বলেছিল, ‘কিছু দারুণ আসছে’। কিন্তু এল শুধু প্রতারণা।”
আজ সেই ওয়েবসাইটে লেখা আছে একমাত্র বাক্য—“Get ready, something cool is coming!”
কিন্তু কাশ্মীরের মানুষ জানে, তাদের শীতল উপত্যকায় এখন কেবল ঠান্ডা বাতাস আর ভাঙা স্বপ্নের প্রতিধ্বনি ঘুরে বেড়ায়।
















