গাজার ভগ্নস্তূপের মাঝে শিশুটি বসে আছে একটি ভাঙা খেলনা ঘোড়ার পিঠে— যেন পুরো অঞ্চলের শিশুহীন শৈশবের প্রতীক। এমন এক সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দিলেন, খুব শিগগিরই গাজায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনী নামবে— তাঁর ২০ দফা শান্তি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে ট্রাম্প বলেন, “খুব শিগগিরই এটি ঘটতে যাচ্ছে। গাজার পরিস্থিতি এখন অনেক ভালোভাবে এগোচ্ছে।” তিনি দাবি করেন, কয়েকটি “অত্যন্ত শক্তিশালী দেশ” ইতোমধ্যেই প্রস্তুত আছে এই মিশনে অংশ নিতে, যদি হামাসের সঙ্গে কোনো জটিলতা দেখা দেয়। যদিও হামাস এখনও নিরস্ত্র হওয়ার ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ এ নিয়ে দু’বছর মেয়াদি একটি ম্যান্ডেট অনুমোদনের আলোচনায় বসতে চলেছে— যাতে একটি অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনিক সংস্থা ও শান্তিরক্ষী বাহিনী গঠনের বিষয়টি নির্ধারিত হবে। এই বাহিনীর দায়িত্ব হবে সাধারণ মানুষের সুরক্ষা, সীমান্ত নিরাপত্তা রক্ষা এবং ফিলিস্তিনি পুলিশের প্রশিক্ষণ দেওয়া।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস আল জাজিরাকে বলেন, গাজায় যেকোনো শান্তিরক্ষী বাহিনী পাঠানোর আগে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি থাকা অপরিহার্য— যাতে এটি সত্যিকারের ফিলিস্তিনি জনগণের সহায়ক হয়।
মার্কিন প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার থেকেই আলোচনার সূচনা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যেই প্রস্তাবের খসড়া পাঠিয়েছে নিরাপত্তা পরিষদের ১০ নির্বাচিত সদস্য ও কয়েকটি আঞ্চলিক অংশীদারের কাছে।
রয়টার্সের তথ্যমতে, এই প্রস্তাবটি মিশর, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব ও তুরস্ক দেখেছে। প্রস্তাব অনুযায়ী, ২০ হাজার সদস্যের একটি বাহিনী গঠন করা হবে, যাদের “প্রয়োজনে সবধরনের পদক্ষেপ” নেওয়ার অনুমতি থাকবে— অর্থাৎ প্রয়োজনে অস্ত্র ব্যবহারেরও।
হামাসের নিরস্ত্রীকরণ ট্রাম্প পরিকল্পনার একটি প্রধান শর্ত। এই বাহিনী হামাসের “আক্রমণাত্মক অবকাঠামো” ধ্বংস ও পুনর্গঠন ঠেকানোর দায়িত্বও পাবে।
ট্রাম্পের এই পরিকল্পনা থেকেই ১০ অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি ও বন্দি বিনিময় চুক্তি সম্ভব হয়েছিল। তবে ইসরায়েল বারবার বোমাবর্ষণ ও ত্রাণে বাধা সৃষ্টি করে সেই চুক্তি ভঙ্গ করছে।
এ প্রেক্ষাপটে, তুরস্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। তারা হামাসকে শান্তি পরিকল্পনা গ্রহণে রাজি করায় এবং ইস্তাম্বুলে কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের একত্রিত করে আন্তর্জাতিক সমর্থন জোগাড়ে উদ্যোগী হয়।
তুরস্ক বরাবরই ইসরায়েলের গাজা আগ্রাসনকে গণহত্যা বলে নিন্দা জানিয়ে আসছে। দেশটি দাবি করেছে— ইসরায়েলকে যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে হবে এবং ফিলিস্তিনে মানবিক সহায়তার প্রবেশে আর বাধা দেওয়া চলবে না।
কিন্তু ইসরায়েল কঠোর অবস্থানে অনড়। প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী গিডন সার দুজনেই ঘোষণা দিয়েছেন, “গাজায় কোনো তুর্কি সশস্ত্র উপস্থিতি মেনে নেওয়া হবে না।”
নেতানিয়াহু সেপ্টেম্বর মাসে ট্রাম্পের সঙ্গে এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, “ইসরায়েল দীর্ঘমেয়াদে গাজার নিরাপত্তার দায়িত্ব রাখবে, এবং এর চারপাশে একটি নিরাপত্তা বলয় বজায় থাকবে।”
অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ডের প্রধান সম্প্রতি গাজা সফরে জানিয়েছেন— মার্কিন সৈন্যরা সেখানে অবস্থান নেবে না।
গাজার আকাশে এখনো ধোঁয়া ভাসছে, ভাঙা ভবনের নিচে শিশুদের কান্না মিশছে বাতাসে। আর বিশ্বজুড়ে আলোচনার টেবিলে বসে আঁকা হচ্ছে “শান্তির মানচিত্র”— যেখানে শান্তি এখনো এক দূরাগত স্বপ্ন, এক নিঃশব্দ প্রার্থনা।
















