একজন মা ছুটছেন গুলির শব্দ পেছনে রেখে। কোলের শিশুকে আঁকড়ে ধরে রাত পেরোচ্ছেন, ড্রোন হামলার ভয়ে আঁধারেই চলছেন পথে পথে। হাতে নেই পানি, মুখে নেই অন্ন, সামনে নেই নিরাপত্তার কোনো আশ্রয়। এটাই আজকের দারফুর, এটাই সুদান— যেখানে যুদ্ধ কেবল বন্দুকের গর্জন নয়, মানবতার বিরুদ্ধেও এক নীরব গণহত্যা।
তিন বছর ধরে চলা এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতে সাধারণ মানুষ বন্দী হয়ে পড়েছে নিজেদেরই ভূমিতে। এল ফাশেরসহ দারফুরের বহু গ্রাম ঘেরাও করে রেখেছে যুদ্ধবাজ শক্তিগুলো। যারা পালাতে চায়, তারা গুলিতে ঝরে যায়; আর যারা থেকে যায়, তারা ধীরে ধীরে ক্ষুধা, রোগ আর সহিংসতার হাতে মরে।
এই যুদ্ধের সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো নারীদের ও শিশুদের ওপর নেমে আসা নির্যাতনের ঝড়। ধর্ষণ এখানে হয়ে উঠেছে অস্ত্র— ভয় দেখানোর, দমন করার, এক প্রজন্মকে ধ্বংস করার হাতিয়ার। মেয়েরা দিনের বেলা জোর করে শ্রমে নিযুক্ত হয়, আর রাতে তাদের ওপর চলে নৃশংস নির্যাতন, প্রায়ই অন্যদের সামনে। অনেকেই কিশোরী, কেউ কেউ আবার শিশুমাতাও হয়েছে, কিন্তু অপুষ্ট দেহে বুকের দুধ দেওয়ারও শক্তি নেই তাদের।
অপরাধীরা এখন আর অপরাধ ঢাকতে চায় না। এতটাই স্বাভাবিক হয়ে গেছে এই সহিংসতা যে ঘটনা নথিভুক্ত করতেও প্রাণ দিতে হয়। উত্তর দারফুরের তাওইলায় এখন কেবল একটি ক্লিনিক— ডাক্তারস উইদআউট বর্ডারস পরিচালিত— যেখানে ধর্ষণের শিকার নারীরা চিকিৎসা পান।
শুধু মেয়েরাই নয়, ছেলেরাও টেনে নেওয়া হচ্ছে যুদ্ধে। গত দশ দিনে তিনটি ট্রাকে করে শিশুদের নিয়োগের খবর এসেছে দক্ষিণ দারফুর থেকে। পরিবারগুলো হঠাৎই নিখোঁজ হচ্ছে— যেন মাটির নিচে গিলে নিচ্ছে যুদ্ধ।
মানবিক সহায়তাকারীরাও নিরাপদ নন। অনেককেই অপহরণ, নির্যাতন, এমনকি হত্যা করা হচ্ছে মুক্তিপণ আদায়ের জন্য। যারা ত্রাণ পৌঁছে দিচ্ছেন, তাঁদের অনেকেই সুদানি নারী— জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাঁরা অন্যদের জন্য রুটি, পানি আর আশ্রয়ের খোঁজ দেন।
সহিংসতা এখন জাতিগত রূপও নিয়েছে। এক শরণার্থী বলেন, “আমি ফিরতে পারব না, আমার ত্বকের রঙই বলে দেবে আমি কোন গোত্রের, আর সেই কারণেই আমাকে মেরে ফেলবে তারা।”
সুদান আজ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাস্তুচ্যুতি সংকটের কেন্দ্র। ৩ কোটি মানুষ এখন তীব্র মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় আছে। ১ কোটি ৫০ লাখ মানুষ গৃহহীন। ক্ষুধা ছড়িয়ে পড়ছে, কলেরা ভয়াবহ আকার নিচ্ছে, হাসপাতাল ভেঙে পড়েছে, স্কুল বন্ধ— ১ কোটি ৩০ লাখ শিশু আজ শিক্ষা হারিয়ে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে।
তবু, এই অন্ধকারের মাঝেই আশার আলো হয়ে জ্বলছে সুদানি নারীদের সাহস। তারা আশ্রয়কেন্দ্র চালাচ্ছে, সহিংসতার শিকারদের পাশে দাঁড়াচ্ছে, শিশুদের শেখাচ্ছে বাঁচতে ও শিখতে। তারা জানে তাদের ভূমি, জানে তাদের মানুষ, আর তাই মৃত্যুর ভেতর থেকেও জীবনের আলো জ্বালাতে চায়।
কিন্তু মানবিক সহায়তা তহবিল ভয়াবহভাবে কম। প্রয়োজনের মাত্র এক-চতুর্থাংশ সহায়তা এসেছে এখন পর্যন্ত। অর্থ না পেলে লক্ষ লক্ষ মানুষ খাদ্য, ওষুধ, ও আশ্রয় হারাবে— অনাহারের কালো ছায়া নেমে আসবে। নারী ও শিশুদের সুরক্ষা এখন বিলাসিতা নয়, এটি টিকে থাকার লড়াই।
এ যুদ্ধ শুধু সহিংসতার নয়— এটি উদাসীনতারও যুদ্ধ। বিশ্ব যতদিন চুপ থাকবে, ততদিন মৃত্যুর মিছিল বাড়বে। আন্তর্জাতিক সমাজকে এখনই এগিয়ে আসতে হবে, যুদ্ধাপরাধ, ধর্ষণ, জাতিগত হত্যাযজ্ঞ ও ত্রাণকর্মীদের ওপর হামলার তদন্তে সহায়তা দিতে হবে। নীরবতা কোনো নিরপেক্ষতা নয়— নীরবতা মানে হত্যার অনুমতি।
সরকার ও দাতাদের এখনই তহবিল দিতে হবে, ত্রাণ পৌঁছানোর পথ খুলে দিতে হবে, বেসামরিক মানুষের ওপর হামলা বন্ধে চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
প্রতিদিন যারা জীবন বাজি রেখে অন্যদের বাঁচাচ্ছে, সেই মানবিক যোদ্ধাদের সাহসের জবাব দিতে হবে আমাদের মানবতার কর্মে।
সবচেয়ে বড় কথা, সুদানের নারীরা ও মেয়েরা হতে হবে শান্তি গড়ার অংশীদার। কারণ তারাই আজও আশ্রয় দিচ্ছে, সংগঠিত করছে, পুনর্গঠন করছে— তাদের হাতেই লুকিয়ে আছে সেই ভবিষ্যৎ, যেখানে সুদান আবার দাঁড়াতে পারবে নিজের মর্যাদায়।
















