আমাজনের হৃদয়ে, ব্রাজিলের বেলেম শহরে শুরু হয়েছে বিশ্ব জলবায়ু সম্মেলন কপ ৩০। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আগত নেতা ও বিজ্ঞানীরা যখন একত্রিত হয়ে জলবায়ু সংকট মোকাবিলার প্রতিশ্রুতি উচ্চারণ করছেন, তখনই সমালোচনার ঝড় উঠেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরুদ্ধে।
সম্মেলনে উপস্থিত বহু নেতা ট্রাম্পের জলবায়ু পরিবর্তন অস্বীকারের অবস্থানকে “মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই নেতা মিথ্যা প্রচার করছেন, জলবায়ুবিষয়ক বিজ্ঞানকে অস্বীকার করছেন এবং নীতি বদলের নামে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অস্তিত্বকে বিপন্ন করছেন।
ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টার্মার দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, “একসময় জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা ছিল ঐক্যের প্রতীক, আজ সেই ঐক্য ভেঙে গেছে।” তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, “ব্রিটেন এখনও জলবায়ু আন্দোলনে সর্বান্তকরণে যুক্ত।”
তবে ট্রাম্প অনুপস্থিত থাকলেও তার ছায়া যেন ছেয়ে আছে পুরো বেলেমে। গত সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বক্তব্য রাখতে গিয়ে ট্রাম্প জলবায়ু পরিবর্তনকে “মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতারণা” বলে বর্ণনা করেছিলেন। তিনি নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিরোধিতা করে বলেছিলেন, “শিল্পোন্নত দেশগুলোকে নিজেদের ধ্বংসের পথে ঠেলে দেওয়া এই বৈশ্বিক ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করতে হবে।”
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা তার বক্তব্যে সরাসরি নাম না করেই সতর্ক করে বলেন, “চরমপন্থী শক্তিগুলো মিথ্যা সংবাদ তৈরি করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এমন এক পৃথিবীর দিকে ঠেলে দিচ্ছে, যা চিরতরে বদলে যাবে উষ্ণায়নের আগুনে।”
চিলি ও কলম্বিয়ার নেতারা আরও সরাসরি ভাষায় ট্রাম্পকে “মিথ্যাবাদী” বলে অভিহিত করেন এবং বিশ্বকে আহ্বান জানান যুক্তরাষ্ট্রের জলবায়ু নীতিকে উপেক্ষা করতে। চিলির পরিবেশমন্ত্রী মাইসা রোজাস বলেন, “বিজ্ঞান স্পষ্ট — সত্যকে বিকৃত করা মানবতার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা।”
কিন্তু যতই তীব্র হোক বক্তৃতার ঝড়, বাস্তবের পদক্ষেপে অগ্রগতি ততটাই কঠিন। বেলেমে খুব অল্পসংখ্যক রাষ্ট্রপ্রধান উপস্থিত হয়েছেন, আর অনেক দেশই এখনও নতুন কার্বন নিঃসরণ কমানোর পরিকল্পনা জমা দেয়নি।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী যেখানে ঐক্যের আহ্বান জানালেন, ঠিক সেখানেই তার দেশ বড় একটি ধাক্কা দিয়েছে আয়োজক ব্রাজিলকে। তারা ঘোষণা করেছে, বিশ্বের বন সংরক্ষণের জন্য গঠিত ১২৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিলে যুক্তরাজ্য অংশ নেবে না। এই তহবিলের মাধ্যমে লুলা আশা করেছিলেন, উন্নত দেশগুলো থেকে অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করা যাবে, যা অ্যামাজন ও কঙ্গো অববাহিকার মতো ক্রান্তীয় অরণ্য সংরক্ষণে ব্যয় হবে।
এই অরণ্যগুলো পৃথিবীর মাত্র ৬ শতাংশ জমি জুড়ে রয়েছে, কিন্তু ধারণ করে বিলিয়ন টন কার্বন ও প্রাণের অর্ধেক বৈচিত্র্য। তাই যুক্তরাজ্যের এই সিদ্ধান্তকে অনেকেই “বিশ্বাসঘাতকতা” বলে আখ্যা দিয়েছেন। ব্রিটেনের সাবেক পরিবেশমন্ত্রী লর্ড জ্যাক গোল্ডসমিথ বলেন, “সবাই ভেবেছিল যুক্তরাজ্য নেতৃত্ব দেবে, কিন্তু শেষ মুহূর্তে তারা পিছু হটেছে—ব্রাজিল সরকারের ভেতরে এখন প্রবল ক্ষোভ।”
প্রিন্স উইলিয়াম, যিনি একই দিনে সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন, তহবিলটিকে “প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এক দূরদর্শী পদক্ষেপ” বলে উল্লেখ করেন এবং এটিকে তার আর্থশট পুরস্কারের জন্য মনোনীত করেন।
তিনি নেতাদের উদ্দেশে বলেন, “আমি বিশ্বাস করি মানবতার হাতে এখনও সময় আছে—কঠিন বাস্তবতার মাঝেও আশার শিখা জ্বালানোর। আসুন আমরা এমন এক প্রজন্ম হই, যারা পৃথিবীর গতিপথ বদলে দেবে—প্রশংসার জন্য নয়, অজাত প্রজন্মের নিঃশব্দ কৃতজ্ঞতার জন্য।”
আগামী সোমবার থেকে দুই সপ্তাহব্যাপী আলোচনা চলবে—মূল প্রশ্ন, কীভাবে তহবিল সংগ্রহ করে জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাবের মুখে থাকা দেশগুলিকে সহায়তা করা যায়।
এমন এক সময়ে এই আলোচনা শুরু হচ্ছে, যখন বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে প্রকৃতি প্রতিশোধ নিচ্ছে। গত সপ্তাহে ক্যারিবীয় অঞ্চলে আঘাত হানা হারিকেন মেলিসা অন্তত ৭৫ জনের প্রাণ কেড়েছে, ডুবিয়ে দিয়েছে বহু দ্বীপ। ইম্পেরিয়াল কলেজের গবেষণায় বলা হয়েছে, এই ঝড়ের বৃষ্টিপাতের মাত্রা ১৬ শতাংশ বেড়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে।
বিশ্ব নেতাদের মুখে তাই এখন একই আহ্বান—সময় কম, প্রতিশ্রুতি নয়, এবার চাই কর্ম।
















