দীর্ঘ দুই বছরের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে অবশেষে আলো দেখার আভাস। সুদানের আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) বৃহস্পতিবার ঘোষণা করেছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে গঠিত চার জাতির মধ্যস্থতাকারী দলের প্রস্তাবিত মানবিক যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে প্রস্তুত। এই “কোয়াড” দলের সদস্য সৌদি আরব, মিসর ও সংযুক্ত আরব আমিরাতও।
আরএসএফ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতির লক্ষ্য হচ্ছে সুদানে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় মোকাবিলা করা এবং অসহায় নাগরিকদের রক্ষা করা। তবে সুদানের সরকারি সেনাবাহিনী (এসএএফ) এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেনি।
এই সপ্তাহের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের আরব ও আফ্রিকা বিষয়ক উপদেষ্টা মাসাদ বুলোস জানিয়েছিলেন, উভয় পক্ষই নীতিগতভাবে যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছে। তার ভাষায়, “কোনো পক্ষই আপত্তি জানায়নি, এখন আমরা সূক্ষ্ম দিকগুলো নিয়ে কাজ করছি।”
আল জাজিরার খার্তুম প্রতিনিধি হিবা মরগান জানিয়েছেন, পরিকল্পনাটি প্রথমে তিন মাসের মানবিক যুদ্ধবিরতি দিয়ে শুরু হবে। এই সময়ে খাদ্য, ওষুধ ও সহায়তা পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুলতে পারে।
কিন্তু বাস্তবতা এখনো জটিল। সেনাবাহিনী একাধিকবার বলেছে, তারা লড়াই চালিয়ে যেতে চায় এবং আরএসএফ সদস্যদের সমাজে পুনঃএকীভূত করার কোনো পরিকল্পনা নেই। সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল বুরহান বৃহস্পতিবারের ভাষণে ঘোষণা করেন, “শত্রুর পরাজয়ই এখন আমাদের লক্ষ্য। খুব শিগগিরই নিহতদের প্রতিশোধ নেয়া হবে।”
অন্যদিকে আরএসএফের বিরুদ্ধে উত্তর দারফুরের এল ফাশের শহরে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞের অভিযোগ উঠেছে। গত ২৬ অক্টোবর দীর্ঘ ১৮ মাসের অবরোধ শেষে শহরটি দখলের পর থেকে জাতিসংঘ জানিয়েছে, ৭০ হাজারেরও বেশি মানুষ শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে পালিয়ে গেছে। সাক্ষীরা বলছেন, সেখানে গণহত্যা, যৌন নির্যাতন ও তাৎক্ষণিক মৃত্যুদণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, শহর দখলের সময় একটি শিশু হাসপাতালের ৪৬০ জন রোগী ও চিকিৎসাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের মানবাধিকার গবেষণাগার প্রকাশ করেছে, নতুন স্যাটেলাইট চিত্রে এল ফাশেরে “গণকবরের উপস্থিতি”র ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের মসজিদ ও সাবেক শিশু হাসপাতালের পাশে মাটির অস্বাভাবিক নড়াচড়া দেখা গেছে, যা মৃতদেহ সমাহিত করার চিহ্ন হতে পারে।
সুদানে এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২০২৩ সালের এপ্রিলে। সেনাপ্রধান আল বুরহান ও তার সাবেক উপপ্রধান, আরএসএফ নেতা মোহাম্মদ হামদান দাগলো—যিনি হেমেদতি নামে পরিচিত—এই যুদ্ধের দুই মুখ্য প্রতিপক্ষ। উভয় পক্ষের বিরুদ্ধেই যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা ও নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে।
জাতিসংঘের মানবাধিকার পরিষদের সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, উভয় পক্ষই নির্বিচারে হত্যা, নাগরিকদের ওপর হামলা ও নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত। নারী ও শিশুদের ওপর যৌন সহিংসতার বিশাল প্রমাণও পাওয়া গেছে—বিশেষত আরএসএফ ও এসএএফ সদস্যদের বিরুদ্ধে।
এই নিঃশব্দ মরুভূমির দেশে, যেখানে ধুলোর ঝড়ে হারিয়ে যায় মানুষের আর্তনাদ, সেখানে যদি সত্যিই যুদ্ধবিরতির বাতাস বইতে শুরু করে—তবে হয়তো আবার একদিন শিশুরা কাঁদার বদলে হাসবে, আর গুলির শব্দে নয়, জেগে উঠবে পাখির ডাক।
















