এ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল একযোগে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে বোমা হামলা চালায়। এই অভিযানের নাম ছিল ইসরায়েলের “রোরিং লায়ন” এবং আমেরিকার “এপিক ফিউরি।” একই দিনে ইরান প্রতিশোধে “অনেস্ট প্রমিস ৪” অভিযান চালায়। হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন। ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পর প্রথমবারের মতো ইসরায়েল, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের মধ্যে সরাসরি যুদ্ধ শুরু হয়।
১. যুদ্ধের কারণ ও ধাপ
ইরান ও ইসরায়েলের বিরোধ দীর্ঘস্থায়ী। ১৯৭৯ সাল থেকে ইরানের শাসকরা ইসরায়েল ধ্বংস করার কথা বলেছেন। তেহরান বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রবাদী সংস্থা যেমন হেজবোল্লাহ, হামাস, ইরাকি শিয়ান মিলিশিয়া, হৌথি আন্দোলনকে সমর্থন করে “অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স” তৈরি করেছে। এটি ইরানকে সরাসরি ঝুঁকিতে না পড়ে ক্ষমতা প্রক্ষেপণ করতে সাহায্য করেছে।
২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের হামলা ইসরায়েলের নিরাপত্তা দুর্বল করে। ২০২৫ সালের জুনে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে “রাইজিং লায়ন” ও “মিডনাইট হ্যামার” অভিযান চালায়।
ফেব্রুয়ারি ২৮, ২০২৬-এ হামলার উদ্দেশ্য ছিল ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা ধ্বংস করা, নৌবাহিনী নষ্ট করা, পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ প্রতিহত করা এবং সরকারের পতন নিশ্চিত করা।
২. অঞ্চল ও শক্তি কাঠামোর পরিবর্তন
ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক ধ্বংস হলে অঞ্চলীয় প্রভাবের শূন্যস্থান তৈরি হয়। লেবাননে হেজবোল্লাহ, ইরাকে শিয়ান মিলিশিয়া এবং ইয়েমেনে হৌথিদের অবস্থান পুনঃনির্ধারণের প্রয়োজন।
গুলফের আরব দেশগুলোও যুদ্ধের কারণে কৌশলগত পুনর্বিবেচনার মুখোমুখি। সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের তেহরানের সঙ্গে পূর্বের সম্পর্ক এখন অর্থহীন হয়ে গেছে। ইসরায়েল-আরব স্বাভাবিকীকরণ প্রক্রিয়াও বিরত রয়েছে।
খামেনির মৃত্যু রাজনৈতিক ভূমিকম্প। কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র দুর্বল হলে তিনটি সম্ভাব্য পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে: প্রতিরোধমূলক, বিভাজন বা সংযমী রূপান্তর। তবে অভ্যন্তরীণ জনগণ বিদেশী হামলাকে মুক্তি নয়, অপমান হিসেবে দেখছে।
ইসরায়েলের জন্য পারমাণবিক নীতি নষ্ট ও প্রতিরোধ محور ধ্বংস বড় কৌশলগত জয়, তবে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান নয়। ফিলিস্তিন সমস্যা পুনরায় উঠতে পারে, আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
৩. আন্তর্জাতিক প্রভাব
যুদ্ধ জাতিসংঘ ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সমালোচনা বয়ে এনেছে। ইউরোপ দ্বিধাগ্রস্ত, ফ্রান্স সরাসরি অংশ নিচ্ছে না। চীন সীমিত হিউম্যানিটারিয়ান সহায়তা প্রদান করছে। রাশিয়ার অবস্থান তুলনামূলক সুবিধাজনক, কারণ মার্কিন মনোযোগ মধ্যপ্রাচ্যে চলে গেছে।
৪. যুদ্ধ দীর্ঘায়িত ও মানবিক প্রভাব
যুদ্ধ দ্রুত শেষ না হয়ে প্রলম্বিত হচ্ছে। ইরান ৭,১৭১ বার আক্রমণ চালিয়েছে; মার্কিন ও ইসরায়েলি সামরিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য। মানবিক ও ঐতিহ্যগত ক্ষতি প্রকট; ইউনেস্কো সতর্ক করেছে বিশ্ব ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইরানী জনগণ তাদের শাসকের প্রতি সংহতি দেখাচ্ছে।
৫. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিভাজন
নাটো বিভক্ত; ইউরোপ নির্ধারিত কৌশল খুঁজছে। চীন নিরপেক্ষ, সীমিত হিউম্যানিটারিয়ান সহায়তা দিচ্ছে।
যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী পরিবর্তন বা নতুন স্থিতি তৈরি করছে না, বরং বিশৃঙ্খলা বৃদ্ধি করছে। ইরান অপ্রত্যাশিত অবস্থায়, আরব দেশগুলো অস্থির, ইসরায়েল সামরিক বিজয়ী কিন্তু কূটনৈতিকভাবে বিচ্ছিন্ন। ইতিহাস বলে, অঞ্চলের পুনর্গঠন সময় নেয়, অপ্রত্যাশিত প্রভাব সৃষ্টি করে, এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক বাধার সম্মুখীন হয়। বর্তমান সহিংসতা ভবিষ্যতে স্থিতি বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে কি, তা পুরোপুরি অনিশ্চিত।
















