প্রশান্ত মহাসাগরের নীল বিস্তারে আগুন জ্বলে উঠেছে আবার। সোমবার, মার্কিন বাহিনীর ক্ষেপণাস্ত্রের গর্জনে চারটি সন্দেহভাজন মাদকবাহী নৌকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়—মৃত্যু হয়েছে ১৪ জনের। এই অভিযানের নেতৃত্বে ছিলেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ, যিনি জানান—প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশেই এই আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র।
মেক্সিকোর নৌবাহিনী জানায়, আকাপুলকো উপকূল থেকে প্রায় ৪০০ মাইল দূরে এখনও একজন জীবিতকে খুঁজছে তারা। নোনা জলে ভাসছে ধ্বংসপ্রাপ্ত কাঠের টুকরো, আর সেই জলের নিচে মিলিয়ে গেছে চৌদ্দটি প্রাণ—অপরাধের প্রমাণ না রেখেই।
হেগসেথের ভাষায়, চারটি নৌযান ছিল “নির্ভরযোগ্য গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী” মাদকবাহী। প্রথম আঘাতে মারা যায় আটজন, পরের দুই আঘাতে আরও সাতজন। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে—আগুনে পুড়ে ছাই হচ্ছে ছোট ছোট জাহাজ, সমুদ্রের বুক জুড়ে জ্বলছে আগুনের রেখা।
“আমরা এতদিন অন্যদের মাতৃভূমি রক্ষা করেছি, এখন নিজেদের রক্ষা করছি,” বলেন হেগসেথ। তার কণ্ঠে গর্বের সাথে মিশে ছিল কঠোরতার সুর।
কিন্তু এই অভিযান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে বিশ্ব। মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেইনবাউম জানিয়ে দিয়েছেন—“আমরা এই হামলার সঙ্গে একমত নই।” তিনি যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠকের নির্দেশ দিয়েছেন, বলছেন—“সব আন্তর্জাতিক চুক্তির মর্যাদা থাকতে হবে।”
এখন পর্যন্ত এমন হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৫৭ জন, যার ফলে কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক ক্রমেই তপ্ত হয়ে উঠছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দাবি করছে, প্রশান্ত ও ক্যারিবীয় সাগরজুড়ে মাদকবাহী নৌকাগুলোই তাদের লক্ষ্য। কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনের বিশেষজ্ঞরা বলছেন—“অপরাধ সন্দেহে কাউকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া নয়, ন্যায়বিচার পাওয়াই মৌলিক অধিকার।”
নটরডেম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মেরি এলেন ও’কনেল তীব্র ভাষায় বলেছেন—“যাদের বিচার হয়নি, তাদের হত্যা করা বড় অপরাধ; এটি মাদক পাচারের চেয়েও জঘন্য।”
কলম্বিয়ার উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী মরিসিও জারামিলো বিবিসিকে বলেন, “এই হামলাগুলো অপ্রতিরোধ্য ও আইনবহির্ভূত। যারা সেই নৌকায় ছিল, তাদের আত্মরক্ষার কোনো সুযোগই দেওয়া হয়নি।”
এদিকে ট্রাম্প বলেছেন, আন্তর্জাতিক জলে এসব হামলা চালানোর আইনি অধিকার তার আছে, এমনকি প্রয়োজনে স্থলভাগেও আঘাত হানতে তিনি “সম্পূর্ণ প্রস্তুত”।
ক্যারিবীয় অঞ্চলে ইতিমধ্যেই মোতায়েন করা হয়েছে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও সেনা। বিশ্বের সবচেয়ে বড় যুদ্ধজাহাজ—USS Gerald R Ford—পাঠানো হয়েছে সেখানে।
ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো মাদকচক্রের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। মাদুরো তা অস্বীকার করে বলেছেন—“এটি আমাদের সরকার উৎখাতের পরিকল্পনা।”
ভেনেজুয়েলার অ্যাটর্নি জেনারেল বিবিসিকে বলেন, “এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই—ট্রাম্প আমাদের পতন ঘটাতে চায়, আমাদের সোনা, তেল আর তামার ভাণ্ডার দখল করতে চায়।”
২০২৪ সালের নির্বাচনের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মাদুরোকে বৈধ নেতা হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। সেই বাতাসে এখনও অস্থিরতা ভাসে—সমুদ্রের মতোই উত্তাল, আগুনে জ্বলা, অনিশ্চিত ভবিষ্যতের গন্ধে ভরা।
















