ঢাকা, ২৭ অক্টোবর ২০২৫:
আইসিসি নারী বিশ্বকাপ ২০২৫-এ বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের যাত্রা শেষ হলো কাঙ্ক্ষিত ফল ছাড়াই। রোববার লিগ পর্বের শেষ দিনে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটি বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়ায় বাংলাদেশের ভাগ্য নির্ধারিত হয়। যদিও শেষ রক্ষা হয়েছে আবহাওয়ার কারণে—কারণ, জয়ের জন্য মাত্র ১২৭ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ভারত যখন বিনা উইকেটে ৫৭ রান তুলে জয়ের পথে ছুটছিল, তখনই বৃষ্টি এসে তাদের জয় ছিনিয়ে নেয়। ফলস্বরূপ, জয় নিশ্চিত করতে থাকা ভারতকে এক পয়েন্ট নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতে হয়, আর বাংলাদেশ পায় পয়েন্ট তালিকায় তলানি থেকে সামান্য ওপরে ওঠার সুযোগ।
গত ৩০ সেপ্টেম্বর আট দলের এই টুর্নামেন্ট শুরু হয়েছিল। পয়েন্ট ভাগাভাগির পর বাংলাদেশের অবস্থান হয়েছে সপ্তম। তলানিতে থাকা পাকিস্তান দলের চেয়ে একধাপ এগিয়ে থাকার কারণ একটি জয়। উভয় দলের পয়েন্ট ৩ হলেও, পাকিস্তান তাদের সব পয়েন্ট পেয়েছে বৃষ্টিতে ভেসে যাওয়া ম্যাচ থেকে, আর বাংলাদেশ তাদের একমাত্র জয়টি পেয়েছিল পাকিস্তানের বিপক্ষেই।
পয়েন্ট টেবিলের অবস্থান বাংলাদেশের বিশ্বকাপ পারফরম্যান্সের একটি চিত্র দিলেও, সংখ্যার আড়ালে লুকিয়ে আছে প্রত্যাশা ও বাস্তবতার এক মিশ্র গল্প।
প্রত্যাশা ও প্রস্তুতি ঘাটতি:
বিশ্বকাপের আগে সংবাদ সম্মেলনে কোচ সারওয়ার ইমরান পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের ভালো সুযোগ থাকার কথা বলেছিলেন। তবে অধিনায়ক নিগার সুলতানার কণ্ঠে ছিল প্রস্তুতির ঘাটতির সুর। এপ্রিলের পর থেকে দলটি কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেনি। বড় টুর্নামেন্টের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল, তা না থাকা সত্ত্বেও দল ২০২২ আসরের প্রথম জয়ের রেকর্ডকে বাড়িয়ে নেওয়ার প্রত্যাশা করেছিল।
শুরুর ঝলক ও আনন্দের মুহূর্ত:
২ অক্টোবর শ্রীলঙ্কার কলম্বোয় পাকিস্তানের বিপক্ষে ম্যাচটি ছিল বাংলাদেশের জন্য স্বপ্নের মতো শুরু। মারুফা আক্তারের অসাধারণ সুইং ও নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে প্রথম ওভারেই পাকিস্তানের দুটি উইকেট তুলে নেয় বাংলাদেশ। সেই ম্যাচে মাত্র ১৩০ রানের লক্ষ্য তারা মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে ১১৩ বল হাতে রেখেই জয় করে নেয়। প্রথম ম্যাচেই দাপুটে জয় পাওয়ায় বাংলাদেশের স্বপ্ন বড় হয়ে ওঠে।
বিতর্কিত সিদ্ধান্ত ও ক্যাচ মিসের হতাশা:
তবে দ্বিতীয় ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে বাংলাদেশের স্বপ্নভঙ্গ হয় কার্যত আম্পায়ারের বিতর্কিত সিদ্ধান্তে। ১৭৮ রান করার পর বাংলাদেশ ১০৩ রানে ৬ উইকেট তুলে নিয়ে ইংল্যান্ডকে চাপে ফেললেও হিদার নাইটের অপরাজিত ৭৯ রানের ইনিংস হতাশ করে। সে দিন নাইট দুবার ক্যাচ দিয়েও আম্পায়ারের ‘নট আউট’ সিদ্ধান্তে রক্ষা পান। শূন্য রানে থাকতে নিগারের ক্যাচ এবং ১৩ রানে স্বর্ণা আক্তারের ক্যাচ—দুটিই তৃতীয় আম্পায়ার ‘যথেষ্ট স্পষ্ট নয়’ বলে বাতিল করেন। খোদ নাইটও পরে স্বীকার করেন যে তিনি আউট হয়েছিলেন বলেই ভেবেছিলেন।
এছাড়া, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ক্যাচ মিস এবং শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে বাজে ব্যাটিংয়ের কারণে বাংলাদেশ আরও দুটি নিশ্চিত জয় হাতছাড়া করে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২৩২ রান করেও শেষ দিকে স্বর্ণা ও সুমাইয়ার গুরুত্বপূর্ণ ক্যাচ মিসে জয় ফসকে যায়। অন্যদিকে, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০২ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে গিয়ে শেষ ২ ওভারে মাত্র ১২ রান প্রয়োজন হলেও, শেষ ওভারে অবিশ্বাস্যভাবে ৪ উইকেট হারিয়ে তারা ৭ রানে হেরে যায়। এই পরাজয়ের সঙ্গেই শেষ চারে খেলার আশা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়।
ব্যাটিংয়ের দুর্বলতা ও উজ্জ্বল দিক:
টুর্নামেন্টে বাংলাদেশ সবচেয়ে বেশি ভুগেছে ব্যাটিংয়ে। বৃষ্টিবিঘ্নিত শেষ ম্যাচের আগে পর্যন্ত, তারা ছিল টুর্নামেন্টে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৬৬.৬% বল ‘ডট’ খেলার রেকর্ডধারী। স্ট্রাইক রেটও ছিল দ্বিতীয় সর্বনিম্ন (৫৬.৮৬)। ছক্কা মারার দিক থেকেও তারা ছিল সপ্তম।
তবে, একটি উজ্জ্বল দিক হলো ফিফটির আধিক্য। বাংলাদেশের ব্যাটাররা মোট ৭টি হাফ সেঞ্চুরি করেছেন (৫ জন ব্যাটার)। এই সংখ্যা টুর্নামেন্টে তৃতীয় সর্বোচ্চ, যা দক্ষিণ আফ্রিকা (১০) ও ভারতের (৯) পরই। সোবহানা মোস্তারি ও শারমিন আক্তার দুটি করে এবং নিগার সুলতানা, রুবাইয়া হায়দার ও স্বর্ণা আক্তার একটি করে ফিফটি করেছেন। এর মধ্যে স্বর্ণা আক্তারের ৩৪ বলে ফিফটি মেয়েদের ওয়ানডেতে বাংলাদেশের দ্রুততম।
বোলিংয়ের নিয়ন্ত্রণ:
বোলিং আক্রমণে মারুফা আক্তার তাঁর সুইং এবং নিয়ন্ত্রণ দিয়ে ক্রিকেট বিশ্বে নজর কেড়েছেন। স্পিন-নির্ভর বাংলাদেশ দল ইকোনমি রেটে (৪.৬১) ছিল টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় সেরা (ইংল্যান্ডের ৪.৫১-এর পরেই)। মেডেন নেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের বোলাররা দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন (২৩ মেডেন)। তবে উইকেট নেওয়ার দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল অষ্টম দলের মধ্যে সপ্তম (৩৬ উইকেট), যা শ্রীলঙ্কার (২৩) চেয়ে সামান্য এগিয়ে।
সবমিলিয়ে, মারুফা ও স্বর্ণার ঝলক এবং বড় দলগুলোর বিপক্ষে জয়ের কাছাকাছি যেতে পারার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দিন শেষে বাংলাদেশের বিশ্বকাপ অর্জন ২০২২ আসরের মতো এবারও পয়েন্ট তালিকার সপ্তম স্থানেই সীমাবদ্ধ থাকল।
















