থাইল্যান্ডের রাজপরিবার আজ শোকে নিমজ্জিত। দেশের প্রিয় রানী মা সিরিকিত শুক্রবার ৯৩ বছর বয়সে পরলোকগমন করেছেন। তিনি ছিলেন রাজা ভূমিবল আদুলিয়াদেজের সহধর্মিণী এবং বর্তমান রাজা মাহা বাজিরালংকর্নের মা।
রাজপ্রাসাদের ঘোষণায় জানানো হয়, ব্যাংককের এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। গত ১৭ অক্টোবর থেকে রক্ত সংক্রমণে ভুগছিলেন তিনি। চিকিৎসক দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও তাঁর শারীরিক অবস্থার উন্নতি হয়নি। বয়সজনিত নানা জটিলতায় গত কয়েক বছর তিনি জনসমক্ষে খুব কমই দেখা দিয়েছিলেন।
সিরিকিত ছিলেন এমন এক রানি, যিনি রাজকীয় আভিজাত্যের গণ্ডি পেরিয়ে পৌঁছেছিলেন থাই জনগণের হৃদয়ে। তিনি দেশের দরিদ্র গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে অসংখ্য প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। সংরক্ষণ করেছিলেন থাইল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প, রক্ষা করেছিলেন বন আর প্রকৃতি।
রানি সিরিকিত কিতিয়াকারা ১৯৩২ সালের ১২ আগস্ট ব্যাংককের এক সম্ভ্রান্ত অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সেই বছরই থাইল্যান্ডে নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্রের পরিবর্তে গঠিত হয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। তাঁর মা-বাবা দুজনেই চক্রি রাজবংশের পূর্বপুরুষদের বংশধর ছিলেন।
শৈশবে তিনি যুদ্ধকালীন ব্যাংককে পড়াশোনা করেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তাঁর কূটনীতিক পিতা ফ্রান্সে রাষ্ট্রদূত হিসেবে নিযুক্ত হন, এবং কিশোরী সিরিকিত সেখানেই পড়াশোনা শুরু করেন।
প্যারিসেই তাঁর জীবনের মোড় ঘুরে যায়। মাত্র ১৬ বছর বয়সে তিনি দেখা পান সদ্য সিংহাসনে আরোহণ করা রাজা ভূমিবলের। বন্ধুত্বের সেই সূতা পরে রূপ নেয় গভীর সম্পর্কে। রাজা এক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হলে তিনি সুইজারল্যান্ডে গিয়ে তাঁর সেবায় নিয়োজিত হন। রাজা তাঁকে ভালোবাসার কবিতা লিখতেন, এমনকি একবার তাঁকে উৎসর্গ করে একটি সুরও রচনা করেন “আই ড্রিম অব ইউ।”
১৯৫০ সালে তাঁরা পরস্পরের জীবনে বাঁধা পড়েন। একই বছর রাজাভিষেক অনুষ্ঠানে তাঁরা প্রতিজ্ঞা করেন, “আমরা শাসন করব ন্যায় ও জনগণের সুখের জন্য।”
তাঁদের সংসারে জন্ম নেয় চার সন্তান রাজা মাহা বাজিরালংকর্ন এবং রাজকন্যা উবোলরাটানা, সিরিনধর্ন ও চুলাভর্ন।
বিবাহের পর তাঁরা বিশ্বের নানা দেশে শুভেচ্ছা দূত হিসেবে সফর করেন, বিশ্বনেতাদের সঙ্গে গড়ে তোলেন ব্যক্তিগত সম্পর্ক। তবে ১৯৭০-এর দশক নাগাদ তাঁদের মনোযোগ ফিরে আসে দেশের দিকে দারিদ্র্য, পাহাড়ি উপজাতির মাদকাসক্তি, আর দেশের কমিউনিস্ট বিদ্রোহ দমনেই ব্যস্ত থাকেন তাঁরা।
প্রতিবছর রাজা ও রানী দেশজুড়ে ঘুরে বেড়াতেন, মানুষের সমস্যার কথা শুনতেন, এবং একইসঙ্গে শত শত ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিতেন।
সিরিকিত ছিলেন একাধারে মার্জিত রুচির নারী, আবার অক্লান্ত কর্মী। তিনি পাহাড় পাড়ি দিয়ে দুর্গম গ্রামে যেতেন, যেখানে বয়স্ক নারীরা স্নেহভরে তাঁকে ডাকতেন “আমাদের মেয়ে” বলে। কেউ তাঁর কাছে আসতেন পারিবারিক কলহের অভিযোগ নিয়ে, কেউ রোগব্যাধির কষ্ট নিয়ে তিনি সকলের কথা শুনতেন মনোযোগ দিয়ে।
তবে রাজধানীর সমাজে তাঁর জীবন নিয়ে নানা গুঞ্জনও চলত। কেউ বলতেন, তিনি রাজপ্রাসাদের অন্তরালের রাজনীতিতে প্রভাবশালী, আবার কেউ বলতেন, তাঁর বিলাসী জীবনযাপন নিয়ে। কিন্তু গ্রামীণ মানুষদের কাছে তিনি ছিলেন মমতার প্রতীক।
১৯৭৯ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “গ্রামের মানুষ আর শহরের ধনী সমাজের মধ্যে এক বিভাজন রয়েছে। আমরা চেষ্টা করি সেই ব্যবধান ঘুচিয়ে দিতে, তাঁদের পাশে থাকতে।”
রানি সিরিকিতের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে গড়ে ওঠে অসংখ্য উন্নয়ন প্রকল্প। ১৯৭৬ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন SUPPORT ফাউন্ডেশন যা গ্রামীণ মানুষদের ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্প যেমন সিল্ক বয়ন, গয়না নির্মাণ, চিত্রাঙ্কন ও মৃৎশিল্পে প্রশিক্ষণ দিয়ে আত্মনির্ভর করে তোলে।
পরিবেশ সংরক্ষণেও তাঁর ভূমিকা ছিল অনন্য। কেউ তাঁকে ডাকতেন “সবুজ রানি” বলে। তিনি স্থাপন করেন বন্যপ্রাণী প্রজনন কেন্দ্র, “ওপেন জু” এবং সামুদ্রিক কচ্ছপ রক্ষার হ্যাচারি। তাঁর “ফরেস্ট লাভস ওয়াটার” ও “লিটল হাউস ইন দ্য ফরেস্ট” প্রকল্প দেখিয়েছে কীভাবে বন ও জলের সংরক্ষণ অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথেও যুক্ত।
যেখানে অন্য দেশের রাজপরিবার কেবল আনুষ্ঠানিক ভূমিকা পালন করে, সেখানে রানি সিরিকিত বিশ্বাস করতেন রাজতন্ত্র থাইল্যান্ডের জন্য একটি জীবন্ত প্রতিষ্ঠান।
১৯৭৯ সালের সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “অনেকেই বলেন রাজতন্ত্র এখন অচল। কিন্তু আমি মনে করি, থাইল্যান্ডের প্রয়োজন এমন একজন রাজা, যিনি জনগণকে বুঝবেন। যখন কেউ বলে, ‘রাজা আসছেন,’ তখন হাজার মানুষ ছুটে আসে। এই শব্দটির মধ্যে এক অদ্ভুত জাদু রয়েছে ‘রাজা’ মানেই এক বিস্ময়।”
আজ সেই বিস্ময়ঘেরা রানী মা আর নেই। রেখে গেছেন ভালোবাসার উত্তরাধিকার, মমতার নিঃশব্দ বীজ, আর এক প্রজন্মের অন্তরে জাগানো এক নাম সিরিকিত, থাইল্যান্ডের চিরন্তন রানি মা।
















