প্রতারণা, বিচ্ছিন্নতা ও মাদকাসক্তির শিকার প্রবাসীদের পুনর্বাসন নেই
বাংলাদেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হিসেবে পরিচিত প্রবাসী শ্রমিকরা, যাঁদের ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ বলা হয়, বিদেশে উন্নত জীবনের সন্ধানে গিয়ে গুরুতর মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের শিকার হচ্ছেন। ব্র্যাক মাইগ্রেশন-এর তথ্য অনুযায়ী, গত আট বছরে অন্তত ১৫১ জন প্রবাসী মানসিক ভারসাম্যহীন অবস্থায় দেশে ফিরেছেন।
এই সংকটের প্রতীকী উদাহরণ হয়ে উঠেছেন ২৮ বছর বয়সী সালেহ চৌধুরী মুন্না, যিনি ১৭ বছর বয়সে উন্নত জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। এক দশক প্রবাসে থাকার পর সোমবার রাতে তিনি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফিরে আসেন, কিন্তু নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে চিনতে পারছেন না। তিনি ছিলেন পাসপোর্ট বা কাগজপত্রবিহীন, কেবল বোর্ডিং পাসে নাম লেখা। তাঁর বিভ্রান্ত আচরণ দেখে বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মীরা তাঁকে ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারে পাঠায়।
পরিবারের সন্ধানে মুন্না:
সালেহ মুন্নার বড় ভাই শরীফ চৌধুরী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেখে তাঁর সন্ধান পান। শরীফ জানান, কিশোর বয়সে খারাপ সঙ্গে জড়িয়ে পড়ায় মুন্নাকে প্রবাসে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু সেখানে প্রতিকূলতা, মাদকাসক্তি এবং পরিবারের সঙ্গে দীর্ঘ দেড় বছর যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যের চরম অবনতি ঘটে।
সংকটের কারণ ও সরকারি উদ্যোগের অভাব:
ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের ম্যানেজার আল আমিন নয়ন জানান, মানসিক ভারসাম্যহীন প্রবাসীদের এই সমস্যার কারণ অনুসন্ধানে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই। ব্র্যাকের মতে, এই সংকটের সম্ভাব্য কারণগুলো হলো:
- প্রতারণা ও শোষণ: মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ভুয়া চাকরির প্রতিশ্রুতিতে প্রতারিত হওয়া।
- পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা: দীর্ঘদিন পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের অভাব ও মানসিক চাপ।
- মাদকাসক্তি: প্রবাসে খারাপ সঙ্গ বা পরিস্থিতির শিকার হয়ে মাদকাসক্তিতে জড়িয়ে পড়া।
- কর্মক্ষেত্রের চাপ: অতিরিক্ত কাজের চাপ, অমানবিক আচরণ ও নিম্নমানের জীবনযাপন।
- দূতাবাসের নিষ্ক্রিয়তা: বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর পক্ষ থেকে প্রবাসীদের সমস্যা সমাধানে পর্যাপ্ত সক্রিয়তা না থাকা।
পুনর্বাসন ব্যবস্থা:
ব্র্যাকের তথ্য অনুযায়ী, ফিরে আসা এই প্রবাসীদের জন্য সরকারিভাবে কোনো পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেই। ব্র্যাক মাইগ্রেশন ওয়েলফেয়ার সেন্টারের মতো বেসরকারি সংস্থাই তাঁদের প্রাথমিক সহায়তা দিচ্ছে। সালেহ মুন্নার ক্ষেত্রেও ব্র্যাকের মাধ্যমেই পরিবারের সন্ধান পাওয়া সম্ভব হয়েছে।
ব্র্যাকের প্রস্তাবিত দীর্ঘমেয়াদি সমাধান:
এই জাতীয় সংকট মোকাবিলায় ব্র্যাক দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য সরকারি উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে এবং নিম্নলিখিত পদক্ষেপগুলো গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে:
- তথ্য সংগ্রহ ও গবেষণা: মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যার কারণ অনুসন্ধানে বিস্তারিত গবেষণা ও নীতি প্রণয়ন।
- পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন: মানসিকভাবে অসুস্থ প্রবাসীদের জন্য বিশেষায়িত পুনর্বাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা।
- প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা: প্রবাসে যাওয়ার আগে শ্রমিকদের মানসিক ও আইনি প্রস্তুতির জন্য প্রশিক্ষণ এবং মাদকাসক্তি ও প্রতারণার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি।
- দূতাবাসের সক্রিয়তা: বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাসগুলোর সক্রিয়তা ও সমস্যা সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নিশ্চিত করা।
- পারিবারিক ও সামাজিক সহায়তা: ফিরে আসা প্রবাসীদের পুনর্বাসন ও পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের জন্য সরকারি ও সামাজিক সহায়তা।
সালেহ চৌধুরী মুন্না শুধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি রেমিট্যান্সের মাধ্যমে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা লাখো প্রবাসী শ্রমিকের প্রতিনিধিত্ব করেন। তাঁদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকট একটি জাতীয় সমস্যা, যা অবহেলিত থাকলে দেশের উন্নয়নের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধাদের’ জন্য একটি নিরাপদ ও সুস্থ জীবন নিশ্চিত করতে সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা জরুরি।
১৭ বছর বয়সে নতুন জীবনের স্বপ্ন নিয়ে সৌদি আরবে যাওয়া মুন্না, এক দশক পর আজ মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে ফিরলেন নিজের বাড়িতে, যেখানে তাঁর স্বজনরাও এখন তাঁর কাছে অচেনা।
















