ভারতের বিপক্ষে আসন্ন টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপের গ্রুপ ম্যাচ বয়কটের সিদ্ধান্তকে রাজনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন ক্রিকেট বিশ্লেষক, সাবেক খেলোয়াড় ও রাজনীতিকেরা। এই সংকট নিরসনে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলকে মধ্যস্থতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
রোববার পাকিস্তান সরকার এক বিবৃতিতে জানায়, দেশটির পুরুষ ক্রিকেট দল টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ নিলেও ১৫ ফেব্রুয়ারি ভারতের বিপক্ষে নির্ধারিত ম্যাচে মাঠে নামবে না। এই ঘোষণার পরপরই আইসিসি পাকিস্তানের ‘নির্বাচিত অংশগ্রহণ’ নীতির সমালোচনা করে এবং সিদ্ধান্তটির দীর্ঘমেয়াদি ও গুরুতর প্রভাব নিয়ে ভাবতে পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডকে সতর্ক করে।
ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বৈরিতাকেই এই অবস্থার মূল কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ১৯৪৭ সালে উপমহাদেশ বিভক্ত হওয়ার পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত। কাশ্মীরকে কেন্দ্র করে চারটি যুদ্ধ, অসংখ্য সীমান্ত সংঘর্ষ এবং কূটনৈতিক টানাপোড়েন তাদের ক্রীড়া সম্পর্ককেও প্রভাবিত করেছে। গত মে মাসে দুই দেশ সীমান্তে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়লেও আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় যুদ্ধ এড়ানো সম্ভব হয়।
ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের সহসভাপতি রাজীব শুক্লা আইসিসির অবস্থানের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, খেলাধুলার নীতির কথা আইসিসি স্পষ্টভাবে বলেছে। আইসিসির সঙ্গে আলোচনা না হওয়া পর্যন্ত তারা এ বিষয়ে আর মন্তব্য করবেন না।
তবে দুই দেশের সাবেক ক্রিকেটার ও রাজনীতিকেরা মনে করছেন, আইসিসির উচিত সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে দুই বোর্ডের মধ্যে সেতুবন্ধ তৈরি করা। সাবেক পাকিস্তান অধিনায়ক শহীদ আফ্রিদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, রাজনীতি যেখানে দরজা বন্ধ করে দেয়, সেখানে ক্রিকেট দরজা খুলতে পারে। তিনি আইসিসিকে বক্তব্য নয়, সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিরপেক্ষতা প্রমাণের আহ্বান জানান।
খেলাধুলায় রাজনীতির অনুপ্রবেশ নিয়ে কড়া সমালোচনা করেছেন ভারতের বিরোধী দলের নেতা শশী থারুর। তিনি বলেন, দুই দেশই খেলাকে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানাচ্ছে, যা দুর্ভাগ্যজনক। জানুয়ারিতে আইপিএল থেকে বাংলাদেশি পেসার মুস্তাফিজুর রহমানের চুক্তি বাতিলের ঘটনাকেও তিনি একই ধারার অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন। থারুরের মতে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এবং ক্রিকেটের মতো জনপ্রিয় খেলাকে অন্তত মাঠের ভেতরে মানুষকে একত্র করার মাধ্যম হওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, এখন জরুরি ভিত্তিতে আলোচনা শুরু করা প্রয়োজন এবং আইসিসি এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম হতে পারে।
বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র কয়েক দিন আগে নেওয়া পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত গ্রুপ পর্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় ম্যাচটির ওপর ছায়া ফেলেছে। ভারত–পাকিস্তান ম্যাচটি সাধারণত কোটি দর্শক টানে এবং আয়োজক ও পৃষ্ঠপোষকদের জন্য বড় আয়ের উৎস।
সাবেক পাকিস্তান অধিনায়ক রশিদ লতিফ আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, পাকিস্তান আইসিসির শাস্তির মুখে পড়তে পারে। তবে তিনি মনে করিয়ে দেন, অতীত বিশ্বকাপেও বিভিন্ন দল ম্যাচ বয়কট করেছে। তাঁর মতে, যদি শাস্তি দেওয়া হয়, তবে তা দ্বিচারিতার শামিল হবে।
পাকিস্তান যদি সত্যিই ম্যাচটি বয়কট করে, তাহলে তারা দুটি পয়েন্ট হারাবে, যা গ্রুপের অবস্থানে প্রভাব ফেলতে পারে। ভারত ও পাকিস্তান পরবর্তীতে ফাইনালেও মুখোমুখি হতে পারে, যদিও সে ক্ষেত্রে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা স্পষ্ট নয়। সাবেক ইংল্যান্ড অধিনায়ক কেভিন পিটারসেন প্রশ্ন তুলেছেন, পাকিস্তান কি তাহলে বিশ্বকাপের ফাইনালও খেলবে না?
ভারতের সাবেক ক্রিকেটার মদন লাল বলেছেন, এই সিদ্ধান্ত সাহসের নয়, বরং বোকামির পরিচয়। তাঁর মতে, ভারতের বিপক্ষে অবস্থান দেখাতে গিয়ে পাকিস্তান নিজেদের উন্নতির পথেই বাধা দিচ্ছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষক হর্ষ ভোগলে সতর্ক করে বলেন, এই বয়কটের ফলে আইসিসির আয় কমলে সবচেয়ে কম ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড। কিন্তু পাকিস্তানসহ যেসব দেশ আইসিসির আয়ের ওপর বেশি নির্ভরশীল, তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
পাকিস্তান তাদের বিশ্বকাপ অভিযান শুরু করবে ৭ ফেব্রুয়ারি নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে। গ্রুপ পর্বে তাদের অন্য ম্যাচগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও নামিবিয়ার বিপক্ষে। আইসিসির আগের সমঝোতা অনুযায়ী, প্রতিবেশী দেশ আয়োজক হলেও ভারত ও পাকিস্তান নিরপেক্ষ ভেন্যুতেই তাদের ম্যাচ খেলছে, যার ফলে পাকিস্তান তাদের সব ম্যাচ শ্রীলঙ্কাতেই খেলবে।
















