মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো অঙ্গরাজ্যের কার্লসবাড ক্যাভার্নস জাতীয় উদ্যানে অবস্থিত গভীর গুহাগুলো বিজ্ঞানীদের ভিনগ্রহে প্রাণের সম্ভাবনা নিয়ে নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করছে। এই গুহাগুলোর অন্ধকার পরিবেশে এমন অণুজীবের সন্ধান মিলেছে, যারা সূর্যালোক ছাড়াই আলোকসংশ্লেষ করতে সক্ষম।
ভূতাত্ত্বিক বিজ্ঞানী হ্যাজেল বার্টন যখন গুহার সম্পূর্ণ অন্ধকার অংশে গবেষণা চালাচ্ছিলেন, তখন তিনি এক অভাবনীয় দৃশ্যের মুখোমুখি হন। দেয়ালজুড়ে উজ্জ্বল সবুজ রঙের অণুজীব দেখা যায়, যদিও সেখানে সূর্যের আলো পৌঁছায় না। পরীক্ষায় জানা যায়, এগুলো সায়ানোব্যাকটেরিয়া, যাদের বিশেষ ধরনের ক্লোরোফিল রয়েছে। এই ক্লোরোফিল দৃশ্যমান আলোর বদলে নিকট অবলোহিত আলো ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদন করতে পারে।
চিহুয়াহুয়ান মরুভূমির নিচে বিস্তৃত এই গুহা ব্যবস্থা সালফিউরিক অ্যাসিডের প্রভাবে চুনাপাথর গলে তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের কাছে পরিচিত কার্লসবাড গুহার বাইরেও আরও অনেক অপ্রবেশযোগ্য গুহা রয়েছে, যেগুলোতে দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের স্পর্শ পড়েনি।
গবেষকরা দেখতে পান, চুনাপাথরের দেয়াল দৃশ্যমান আলো শোষণ করলেও নিকট অবলোহিত আলো প্রতিফলিত করে বহু দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে দিতে পারে। ফলে গুহার গভীরতম অংশেও এই আলো পৌঁছে যায় এবং সেখানকার অণুজীবরা তা কাজে লাগিয়ে আলোকসংশ্লেষ চালাতে পারে। পরিমাপে দেখা গেছে, গুহার ভেতরের কিছু স্থানে নিকট অবলোহিত আলোর ঘনত্ব প্রবেশপথের তুলনায় কয়েকশ গুণ বেশি।
এই ধরনের অণুজীব শুধু একটি গুহায় নয়, একই উদ্যানে অবস্থিত অন্যান্য গুহাতেও পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, এসব পরিবেশে প্রাণীরা প্রায় ৪৯ মিলিয়ন বছর ধরে প্রায় অক্ষত অবস্থায় টিকে আছে।
অন্ধকারে প্রাণের এই সক্ষমতা পৃথিবীর বাইরের জগতে প্রাণ অনুসন্ধানে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিজ্ঞানীরা সাধারণত এমন গ্রহের খোঁজ করেন যেখানে তরল পানি ও সূর্যের আলো পাওয়া যায়। তবে নতুন গবেষণা বলছে, যদি কোনো গ্রহ তার নক্ষত্র থেকে নিকট অবলোহিত আলো পায়, তাহলে সেখানে আলোকসংশ্লেষভিত্তিক প্রাণ টিকে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা জানান, আমাদের গ্যালাক্সিতে সবচেয়ে বেশি যে নক্ষত্র পাওয়া যায়, সেগুলো অপেক্ষাকৃত ঠান্ডা ও লাল বর্ণের। এসব নক্ষত্র থেকে দৃশ্যমান আলোর তুলনায় অবলোহিত আলো বেশি নির্গত হয়। এতদিন ধারণা ছিল, এই আলো প্রাণের জন্য যথেষ্ট নয়। কিন্তু গুহার অণুজীবের আবিষ্কার সেই ধারণা বদলে দিচ্ছে।
গবেষকরা এখন মহাকাশ গবেষণা সংস্থার কাছে প্রস্তাব দিয়েছেন, অন্ধকার গুহায় আলোর সর্বনিম্ন মাত্রা ও দীর্ঘতম তরঙ্গদৈর্ঘ্য নির্ণয় করার। এই তথ্য ব্যবহার করে দূরবর্তী গ্রহ পর্যবেক্ষণের ক্ষেত্র সংকুচিত করা যাবে এবং প্রাণের সম্ভাবনা থাকা নক্ষত্র ও গ্রহ চিহ্নিত করা সহজ হবে।
বিজ্ঞানীদের মতে, যদি কোনো গ্রহের বায়ুমণ্ডলে অক্সিজেনের উপস্থিতি ধরা পড়ে, তাহলে তা প্রাণের শক্তিশালী ইঙ্গিত হতে পারে। কারণ জীবনের উপস্থিতি ছাড়া এমনভাবে অক্সিজেন তৈরি হওয়া খুবই বিরল।
এই গবেষণা দেখাচ্ছে, প্রাণের অস্তিত্ব শুধু আলোয় ভরা পরিবেশেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্ধকার, গভীর ও দীর্ঘদিন বিচ্ছিন্ন থাকা জায়গাতেও জীবন টিকে থাকতে পারে—যা ভিনগ্রহে প্রাণের অনুসন্ধানকে আরও বিস্তৃত ও সম্ভাবনাময় করে তুলছে।
















