কোভিড-১৯ লকডাউনের সময় দীর্ঘদিন একা থাকার অভিজ্ঞতার পর ঘরে বসে কাজ শুরু করেছিলেন ম্যানচেস্টারের তেইশ বছর বয়সী পেইসলি। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তিনি নিজেকে ক্রমেই বন্দি ও সমাজবিচ্ছিন্ন মনে করতে থাকেন। তার ভাষায়, মানুষের সঙ্গে কথা বলার ক্ষমতাই যেন হারিয়ে ফেলেছিলেন তিনি। সেই শূন্যতা পূরণে একসময় আশ্রয় নেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কাছে।
পেইসলি জানান, এক পর্যায়ে তিনি দিনে ছয় থেকে আটবার পর্যন্ত চ্যাটজিপিটির সঙ্গে নিজের সমস্যার কথা বলতেন। তার মতে, বাস্তব মানুষের তুলনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথা বলা সহজ মনে হচ্ছিল। তবে তিনি স্বীকার করেন, এই অভ্যাস ধীরে ধীরে বিপজ্জনক হয়ে উঠেছিল।
পেইসলির অভিজ্ঞতা নিয়ে একটি তথ্যচিত্র তৈরি করেছেন বাইশ বছর বয়সী নির্মাতা স্যাম টালেন। তিনি বলছেন, এটি জেন জি প্রজন্মের মধ্যে চলমান এক গভীর নিঃসঙ্গতার সংকটের প্রতিফলন। জেন জি বলতে সাধারণত উনিশশ সাতানব্বই থেকে দুই হাজার বারোর মধ্যে জন্ম নেওয়া প্রজন্মকে বোঝানো হয়, যাদের ডিজিটাল যুগের প্রথম প্রজন্ম হিসেবেও ধরা হয়।
যুক্তরাজ্যের জাতীয় পরিসংখ্যান দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশটিতে জেন জি সবচেয়ে বেশি নিঃসঙ্গতায় ভোগা বয়সভিত্তিক গোষ্ঠী। এক গবেষণায় দেখা গেছে, ষোল থেকে ঊনত্রিশ বছর বয়সীদের এক-তৃতীয়াংশ নিজেকে প্রায়ই বা কখনো কখনো নিঃসঙ্গ বলে মনে করেন।
এই সামাজিক বিচ্ছিন্নতার কারণে অনেক তরুণ এখন পরামর্শ ও মানসিক সমর্থনের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার শরণাপন্ন হচ্ছে। ইংল্যান্ডের একটি যুবকল্যাণ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এগারো থেকে আঠারো বছর বয়সী তরুণদের প্রায় ঊনচল্লিশ শতাংশ এই কারণে চ্যাটবট ব্যবহার করছে। উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডে এই হার আটত্রিশ শতাংশ এবং তাদের মধ্যে একুশ শতাংশ তরুণ জানিয়েছেন, মানুষের চেয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে কথা বলা তাদের কাছে সহজ।
এই তথ্য পাঁচ হাজারের বেশি তরুণকে নিয়ে করা একটি জরিপের ভিত্তিতে প্রকাশ করা হয়েছে।
পেইসলি বলেন, স্কুল শেষ করে সরাসরি ঘরে বসে কাজ শুরু করার পর থেকেই তার সামাজিক দক্ষতায় ভাটা পড়ে। একটি তথ্যচিত্রে তিনি বলেন, তিনি নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলেন এবং কেন মানুষের সঙ্গে কথা বলতে পারছেন না, তা বুঝতে পারছিলেন না। তিনি আশা করেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো তার বন্ধু হয়ে উঠবে।
তথ্যচিত্র নির্মাতা স্যাম টালেন বলেন, মহামারি ডিজিটালভাবে সংযুক্ত হলেও সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন একটি প্রজন্মের মধ্যে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি করেছে। তিনি নিজেও এই বয়সের হওয়ায় অনেকের অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন।
তবে স্যাম মনে করেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দীর্ঘমেয়াদে নিঃসঙ্গতার সমাধান নয়। তার মতে, অনেক তরুণ শুরুতে এটি ব্যবহার করে শূন্যতা পূরণের চেষ্টা করে, কিন্তু পরে বুঝতে পারে এটি টেকসই নয়। তিনি বলেন, এমন এক সমাজ গড়ে উঠেছে, যেখানে মানুষের চেয়ে চ্যাটবটের সঙ্গে কথা বলা সহজ হয়ে গেছে।
যুব উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা বলছেন, তরুণদের কাছে চ্যাটবট আকর্ষণীয় কারণ এটি দ্রুত ও সহজে পাওয়া যায়। তবে তারা উদ্বেগ প্রকাশ করছেন, অনেক তরুণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থেকে পাওয়া তথ্যকে সম্পূর্ণ সত্য বলে ধরে নিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মানবিক আবেগ বা সমালোচনামূলক প্রতিক্রিয়া দেওয়ার ক্ষমতা নেই। ফলে কিশোর-কিশোরীদের মানসিক বিকাশে এটি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষক বলেন, চ্যাটবট সাধারণত বিরোধিতা করে না বা ক্ষতিকর ধারণার বিরুদ্ধে আপত্তি তোলে না। এতে তরুণরা এমন এক অভ্যাসে অভ্যস্ত হতে পারে, যেখানে তারা বাস্তব জীবনের ভিন্নমত বা সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার প্রস্তুতি পায় না।
তথ্যচিত্র নির্মাতা স্যাম টালেন বলেন, তার সঙ্গে কথা বলা অনেক তরুণই মনে করেন, তাদের অভিভাবকরা বর্তমান বাস্তবতা বুঝতে পারছেন না। তারা আগের প্রজন্মের মতো সামাজিক জীবনের পরামর্শ দিলেও, বর্তমান প্রেক্ষাপট যে কতটা আলাদা, তা উপলব্ধি করতে পারছেন না।
বিশেষজ্ঞ ও যুবকর্মীরা একমত যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু নিঃসঙ্গতা কাটাতে মানুষের সঙ্গে বাস্তব সম্পর্ক, বিশ্বাসযোগ্য প্রাপ্তবয়স্কদের সহায়তা এবং সামাজিক যোগাযোগের বিকল্প নেই।
















