জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির কর ও ব্যয়সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি বৈশ্বিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টি করেছে। আগামী মাসের আকস্মিক নির্বাচনের আগে ভোগকর স্থগিতের ঘোষণা দেওয়ার পর জাপানের সরকারি বন্ড ও মুদ্রাবাজারে বড় ধরনের ওঠানামা দেখা গেছে।
ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখের নির্বাচনে ক্ষমতায় ফিরলে খাদ্য ও অ্যালকোহলবিহীন পানীয়ের ওপর আট শতাংশ ভোগকর দুই বছরের জন্য স্থগিত করার ঘোষণা দেন তাকাইচি। এই ঘোষণার পর থেকেই জাপানি সরকারি বন্ডের সুদহার দ্রুত বেড়ে যায় এবং ইয়েনের মান অস্থির হয়ে ওঠে।
বাজারে এই প্রতিক্রিয়ার পেছনে মূলত জাপানের ঋণের দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা নিয়ে উদ্বেগ কাজ করছে। উন্নত দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণের পরিমাণ সবচেয়ে বেশি। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় অর্থনীতিগুলোর বিপুল বাজেট ঘাটতির কারণে বৈশ্বিক আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়েও নতুন করে দুশ্চিন্তা তৈরি হয়েছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ভোগকর স্থগিত হলে বছরে প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ইয়েন রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হতে পারে। তাকাইচি বলেছেন, ব্যয় পুনর্বিন্যাস ও কর ছাড় পর্যালোচনার মাধ্যমে এই ঘাটতি পূরণ করা হবে, তবে কীভাবে তা করা হবে সে বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
এই করছাড়ের ঘোষণা আসে এমন এক সময়ে, যখন তার সরকার মহামারির পর সবচেয়ে বড় প্রণোদনা প্যাকেজ অনুমোদন করেছে। এতে শিশুপ্রতি নগদ সহায়তা, বিদ্যুৎ ও গ্যাস বিল ভর্তুকি এবং খাদ্য কুপনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
ঘোষণার পর জাপানের দীর্ঘমেয়াদি সরকারি বন্ডের সুদহার রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছায়। চল্লিশ বছর মেয়াদি বন্ডের সুদহার চার শতাংশ ছাড়িয়ে যায়, যা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আস্থার ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। সাধারণত সরকারি বন্ডকে নিরাপদ বিনিয়োগ ধরা হলেও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা নিয়ে সন্দেহ দেখা দিলে বিনিয়োগকারীরা বেশি সুদ দাবি করেন।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জাপানের ঋণ জিডিপির তুলনায় ইতোমধ্যে দুইশ ত্রিশ শতাংশের বেশি। দীর্ঘদিন ধরে অর্থনৈতিক স্থবিরতা কাটাতে সরকারের ধারাবাহিক ঘাটতি ব্যয়ের ফলেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্সের তুলনায় জাপানের ঋণ অনুপাত অনেক বেশি।
এ অবস্থায় জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও দীর্ঘদিনের সহজ মুদ্রানীতি থেকে সরে এসে বন্ড কেনা কমাচ্ছে। ফলে বাজারে সুদহার নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে।
জাপানের বাজারে এই অস্থিরতার প্রভাব দেশটির সীমানা ছাড়িয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদহারও বেড়েছে। কারণ জাপানের বিনিয়োগকারীরা দেশে বেশি মুনাফা পেলে বিদেশি বন্ড বিক্রি করে দিতে পারেন।
বর্তমানে জাপানি বিনিয়োগকারীদের হাতে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বন্ডের বড় অংশ রয়েছে। এ কারণে জাপানের বাজারে পরিবর্তন হলে যুক্তরাষ্ট্রসহ বৈশ্বিক বাজারে তার প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, জাপান এখনই আর্থিক সংকটে পড়ছে না। দেশটির অধিকাংশ ঋণ স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর হাতে এবং ইয়েনে নির্ধারিত, ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের হঠাৎ প্রত্যাহারে বড় ধাক্কার ঝুঁকি কম। পাশাপাশি সুদের হার এখনও অন্যান্য দেশের তুলনায় কম।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক অস্থিরতা মূলত সরকারের নীতিগত বার্তা ও আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে বাজারের উদ্বেগের প্রতিফলন। যদিও জাপানের পরিস্থিতি তুলনামূলকভাবে সামালযোগ্য, তবু উচ্চ ঋণ ও বড় ঘাটতিতে থাকা দেশগুলোর জন্য এটি একটি সতর্ক সংকেত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
















