বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বৈজ্ঞানিক স্থাপনাগুলোর একটি এখন অতিনিম্ন তাপমাত্রার ওপর ভর করে মহাবিশ্বের অজানা রহস্য উন্মোচনের চেষ্টা চালাচ্ছে। ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ড সীমান্তের নিচে অবস্থিত লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডার বা এলএইচসি ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা অতি ক্ষুদ্র কণার আচরণ বিশ্লেষণ করেন। এখানে কণাগুলোকে প্রচণ্ড গতিতে সংঘর্ষে পাঠিয়ে সেই সংঘর্ষের ফল পর্যবেক্ষণ করা হয়।
২০৩০-এর দশকে এলএইচসিতে সংঘর্ষের সংখ্যা আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর লক্ষ্য হলো উপ-পরমাণুক কণার আরও সূক্ষ্ম ও নির্ভুল পরিমাপ পাওয়া। বিজ্ঞানীদের আশা, যদি কোনো ফলাফল প্রচলিত স্ট্যান্ডার্ড মডেলের পূর্বাভাস থেকে বিচ্যুত হয়, তাহলে নতুন কোনো পদার্থবিজ্ঞানের ইঙ্গিত মিলতে পারে।
এই অত্যাধুনিক গবেষণার একটি বড় অংশ নির্ভর করছে এমন প্রযুক্তির ওপর, যা ঘরের ফ্রিজেও ব্যবহৃত হয়। কম তাপমাত্রা অনেক ক্ষেত্রে কণার গতি কমিয়ে দেয় বা উপাদানকে স্থিতিশীল করে, ফলে সেগুলো বিশ্লেষণ করা সহজ হয়। এ কারণেই শীতল পরিবেশ বিজ্ঞান গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
এলএইচসির অ্যাটলাস পরীক্ষার কিছু অংশকে মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত ঠান্ডা রাখতে নতুন ধরনের হিট এক্সচেঞ্জার ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কার্বন ডাই-অক্সাইডকে রেফ্রিজারেন্ট হিসেবে নেওয়া হয়েছে, যা আগের ব্যবস্থার তুলনায় পরিবেশের জন্য কম ক্ষতিকর। এই প্রযুক্তি শুধু গবেষণাগারেই নয়, ভবিষ্যতে সুপারমার্কেটের কুলিং সিস্টেমসহ শিল্প খাতেও ব্যবহার করা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে এলএইচসির সব অংশে এতটুকু তাপমাত্রা যথেষ্ট নয়। এর অনেক অংশ পৃথিবীর সবচেয়ে শীতল জায়গাগুলোর মধ্যে পড়ে। প্রায় এক হাজার ইলেক্ট্রোম্যাগনেটকে ঠান্ডা রাখা হয় মাত্র ১.৯ কেলভিনে, যা মাইনাস ২৭১ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই তাপমাত্রায় বিশেষ ধাতব তার বিদ্যুৎ প্রতিরোধহীন হয়ে ওঠে, ফলে বিপুল বিদ্যুৎ প্রবাহেও অতিরিক্ত তাপ তৈরি হয় না।
এই পর্যায়ের শীতলতা অর্জনে ধাপে ধাপে তরল হিলিয়াম ঠান্ডা করতে হয়, যা সম্পূর্ণ হতে সপ্তাহ লেগে যায়। এমন তাপমাত্রা মহাকাশের সবচেয়ে শীতল প্রাকৃতিক অঞ্চলগুলোর চেয়েও কম।
অতিনিম্ন তাপমাত্রা তৈরির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হলো ডাইলিউশন রেফ্রিজারেশন। এতে হিলিয়ামের দুটি ভিন্ন আইসোটোপ ব্যবহার করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় তাপ শোষণের মাধ্যমে পরিবেশ দ্রুত ঠান্ডা হয়ে যায় এবং মিলিকেলভিন মাত্রার তাপমাত্রা অর্জন সম্ভব হয়। এই প্রযুক্তি কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরিতেও অপরিহার্য, কারণ সামান্য তাপও সেখানে বড় ধরনের ত্রুটি সৃষ্টি করতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিশীতল পদার্থবিজ্ঞান এখন গবেষণার এক নতুন সীমান্ত। কোনো বস্তু যদি আগে কখনো না পাওয়া তাপমাত্রায় পৌঁছায়, তাহলে তার আচরণও হতে পারে সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমন পরিবেশে আলো পর্যন্ত অস্বাভাবিকভাবে ধীর গতিতে চলতে পারে।
এই ধরনের শীতল প্রযুক্তি শুধু মৌলিক বিজ্ঞানেই নয়, ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও কাজে আসছে। আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর চিপ বিশ্লেষণে অত্যন্ত কম তাপমাত্রা ব্যবহার করে আরও স্পষ্ট ছবি তোলা সম্ভব হচ্ছে, যা শিল্পমান নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সব মিলিয়ে, মহাবিশ্বের গভীর রহস্য জানার পথে বিজ্ঞানীরা এখন শীতলতার চরম সীমাকেই বেছে নিচ্ছেন, যেখানে এক ফোঁটা তাপও বদলে দিতে পারে জ্ঞানের মানচিত্র।
















