‘পুরো জাতিকেই শাস্তি দেওয়া হয়েছে’; দোষীদের মুখোশ উন্মোচনের নির্দেশ প্রধান উপদেষ্টার
বাংলাদেশে বিগত ১৫ বছরে অনুষ্ঠিত তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪) ছিল সুপরিকল্পিত জালিয়াতি ও জনগণের ভোটাধিকার হরণের এক নির্লজ্জ দলিল। সোমবার (১২ জানুয়ারি) বিকেলে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় ‘জাতীয় নির্বাচন তদন্ত কমিশন’-এর চূড়ান্ত প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ খরচ করে যেভাবে পুরো নির্বাচন ব্যবস্থাকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলা হয়েছে, তা ইতিহাসের কলঙ্কজনক অধ্যায়। ভবিষ্যতে যেন আর কখনোই ‘নির্বাচন ডাকাতি’ সম্ভব না হয়, সে লক্ষ্যে জড়িতদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি।
অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি শামীম হাসনাইন-এর নেতৃত্বাধীন তদন্ত কমিশন তাদের প্রতিবেদনে বিগত তিনটি নির্বাচনের জালিয়াতির কৌশলগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছে। প্রতিবেদন গ্রহণকালে প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলসহ সরকারের উচ্চপদস্থ উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রতিবেদনে উঠে আসা চাঞ্চল্যকর তথ্যসমূহ
তদন্ত কমিশন তিনটি নির্বাচনের কারচুপির ধরনকে তিনটি ভিন্ন কৌশলে বিভক্ত করেছে:
১. ২০১৪: ১৫৩ আসনের ‘বিনা ভোট’ নাটক: আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় রাখতে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতানো হয় এবং বাকি ১৪৭টি আসনে সাজানো নির্বাচন করা হয়।
২. ২০১৮: ‘রাতের ভোট’ ও ১০০% ভোটিং: নির্বাচনে ৮০ শতাংশ কেন্দ্রে আগের রাতেই ব্যালটে সিল মারা হয়েছিল। কোনো কোনো কেন্দ্রে ভোট প্রদানের হার ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার অবিশ্বাস্য রেকর্ডও তদন্তে উঠে এসেছে।
৩. ২০২৪: ‘ডামি’ প্রার্থীর অপকৌশল: বিরোধী দলগুলো বর্জন করায় নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দেখাতে নিজস্ব ‘ডামি’ প্রার্থী দাঁড় করানোর কৌশল নেয় ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অপব্যবহার
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ভোট ডাকাতির এই মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রশাসন, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন এবং গোয়েন্দা সংস্থার একটি নির্দিষ্ট অংশকে নগ্নভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল। একটি বিশেষ ‘নির্বাচন সেল’-এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে এসব অপকর্ম নিয়ন্ত্রণ করা হতো।
প্রধান উপদেষ্টার কঠোর বার্তা
প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন:
“আমরা ভোট ডাকাতির কথা শুনেছিলাম, কিন্তু সিস্টেমকে এভাবে বিকৃত করা হতে পারে তা ভাবনার অতীত। এ দেশের মানুষ অসহায়ভাবে তাকিয়ে ছিল। এখন সময় এসেছে অপরাধীদের চেহারা জনগণের সামনে নিয়ে আসার। যারা যেভাবে এই জালিয়াতির সাথে জড়িত ছিল, তাদের সবার রেকর্ড থাকা দরকার।”
ভবিষ্যৎ সুপারিশ
কমিশন তাদের প্রতিবেদনে ভবিষ্যৎ নির্বাচনকে কলঙ্কমুক্ত করতে বেশ কিছু সুপারিশ পেশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—নির্বাচন কমিশনকে সাংবিধানিকভাবে স্বাধীন করা, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ বন্ধে আইন প্রণয়ন এবং বিগত নির্বাচনে জড়িত কর্মকর্তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান।
অনুষ্ঠানে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান, তথ্য উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান ও সংস্কৃতি উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকীসহ কমিশনের অন্যান্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
















