১২ জানুয়ারি ২০২৬: মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ওপর গণহত্যার অভিযোগে দায়ের করা ঐতিহাসিক মামলার পূর্ণাঙ্গ শুনানি শুরু করতে যাচ্ছে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ বিচারিক সংস্থা আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে)। সোমবার দ্য হেগে এই মামলার শুনানি শুরু হবে, যা গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে আইসিজেতে প্রথম পূর্ণাঙ্গ গণহত্যা মামলা।
এই মামলার রায় শুধু মিয়ানমারের জন্য নয়, আন্তর্জাতিক বিচারব্যবস্থার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এর প্রভাব গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা মামলাসহ ভবিষ্যতের অন্যান্য গণহত্যা সংক্রান্ত আইনি লড়াইয়েও পড়তে পারে।
তিন সপ্তাহব্যাপী এই শুনানি শুরু হবে সোমবার গ্রিনিচ মান সময় সকাল ৯টায়। ২০১৯ সালে পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া এই মামলা দায়ের করে। এর দুই বছর আগে, ২০১৭ সালে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী রাখাইন রাজ্যে অভিযান চালায়, যার ফলে প্রায় সাত থেকে সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা নিজেদের ঘরবাড়ি ছেড়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।
বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা সে সময় হত্যা, গণধর্ষণ এবং গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়ার ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। জাতিসংঘের একটি তদন্ত দল ওই অভিযানে গণহত্যার উপাদান থাকার কথা উল্লেখ করলেও মিয়ানমার সরকার তা অস্বীকার করে আসছে। তাদের দাবি, এটি সশস্ত্র রোহিঙ্গা গোষ্ঠীর হামলার জবাবে পরিচালিত একটি বৈধ নিরাপত্তা অভিযান ছিল।
জাতিসংঘের মিয়ানমার বিষয়ক স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার প্রধান নিকোলাস কুমজিয়ান বলেন, এই মামলাটি গণহত্যার সংজ্ঞা, প্রমাণ উপস্থাপনের মানদণ্ড এবং রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশের কক্সবাজারে বসবাসরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মধ্যে এই শুনানি নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। দুই সন্তানের জননী জানিফা বেগম বলেন, আমরা ন্যায়বিচার ও শান্তি চাই। সেনা অভিযানে আমাদের গ্রামের পর গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, পুরুষদের হত্যা করা হয়েছে, নারীরা ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আরেক শরণার্থী ও সাবেক শিক্ষক মোহাম্মদ সাঈদ উল্লাহ বলেন, আইসিজে কোনো রায় কার্যকর করার সরাসরি ক্ষমতা না থাকলেও এই মামলার মাধ্যমে আমাদের দীর্ঘদিনের ক্ষত কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে বলে আশা করি। অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। বিচার দ্রুত ও ন্যায্য হলে প্রত্যাবাসনের পথও খুলতে পারে।
মিয়ানমারের উইমেনস পিস নেটওয়ার্কের প্রধান ওয়াই ওয়াই নু বলেন, এই বিচার শুরু হওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য নতুন আশার আলো। দীর্ঘদিনের নিপীড়নের অবসান ঘটাতে বিশ্বকে দৃঢ়ভাবে ন্যায়বিচারের পথে এগোতে হবে।
আইসিজের এই শুনানিতে প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক আদালতে রোহিঙ্গা নির্যাতনের শিকারদের বক্তব্য শোনা হবে। তবে সংবেদনশীলতা ও ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কারণে এসব শুনানি সাধারণ মানুষ ও গণমাধ্যমের জন্য বন্ধ থাকবে।
২০১৯ সালের প্রাথমিক শুনানিতে তৎকালীন মিয়ানমার নেত্রী অং সান সু চি গাম্বিয়ার আনা অভিযোগকে অসম্পূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বলে দাবি করেছিলেন। পরবর্তীতে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন এবং দেশটি গৃহযুদ্ধ ও অস্থিরতায় নিমজ্জিত হয়।
বর্তমানে জান্তা সরকারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া জাতীয় ঐক্য সরকার (এনইউজি) আইসিজের এখতিয়ার মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং মামলার প্রাথমিক আপত্তি প্রত্যাহার করেছে। এক বিবৃতিতে তারা স্বীকার করেছে, অতীতের রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার কারণেই সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতে এমন অপরাধ যেন আর না ঘটে, সে বিষয়ে তারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
এদিকে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে পৃথকভাবে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি রয়েছে। সেখানে তাঁর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে।
অধিকারকর্মীদের মতে, ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে নিপীড়ন আরও তীব্র হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে আইসিজেতে শুরু হওয়া এই মামলা আন্তর্জাতিক ন্যায়বিচারের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে উঠতে পারে।
















