মেট্রোরেল ও মেগা প্রকল্পে ৯০% পর্যন্ত বরাদ্দ হ্রাস; গুরুত্ব পাচ্ছে পরিবেশ ও স্থানীয় সরকার
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও কৃচ্ছ্রসাধনের অংশ হিসেবে ২ লাখ কোটি টাকার সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (আরএডিপি) চূড়ান্ত করেছে পরিকল্পনা কমিশন। গত বছরের তুলনায় এবারের উন্নয়ন বাজেট ৩০ হাজার কোটি টাকা কমানো হয়েছে। সোমবার (০৫ জানুয়ারি) পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সংশোধিত বাজেটে মেট্রোরেলসহ একাধিক বড় প্রকল্পের বরাদ্দ প্রায় ৯০ শতাংশ পর্যন্ত ছেঁটে ফেলা হয়েছে। মোট বরাদ্দের মধ্যে সরকারের নিজস্ব তহবিল থেকে ১ লাখ ২৮ হাজার কোটি এবং বৈদেশিক ঋণ হিসেবে ৭২ হাজার কোটি টাকা সংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আগামী ১২ জানুয়ারি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এই সংশোধিত এডিপি’র চূড়ান্ত অনুমোদন দেবেন। এবারের বাজেটে কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক খাতে বরাদ্দ কমলেও পরিবেশ ও বিজ্ঞান প্রযুক্তিতে গুরুত্ব বাড়ানো হয়েছে।
মেগা প্রকল্পে বিশাল ধাক্কা: মেট্রোরেল ও বিমানবন্দর
সংশোধিত বাজেটে সবচেয়ে বড় কাটছাঁট হয়েছে বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে। খরচের লাগাম টানতে প্রকল্পভিত্তিক বরাদ্দ কমানো হয়েছে অবিশ্বাস্য হারে:
- মেট্রোরেল লাইন-১: এই প্রকল্পে বরাদ্দ ৮ হাজার ৬৩১ কোটি টাকা থেকে কমিয়ে মাত্র ৮০১ কোটি টাকা করা হয়েছে (৯১% হ্রাস)।
- শাহজালাল বিমানবন্দর সম্প্রসারণ: বরাদ্দ ১ হাজার ৩৯ কোটি থেকে নামিয়ে আনা হয়েছে ৩০৬ কোটি টাকায়।
- মাতারবাড়ী বন্দর: বরাদ্দ ৪ হাজার ৬৮ কোটি থেকে কমিয়ে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা করা হয়েছে।
- কিশোরগঞ্জ এলিভেটেড সড়ক: এই প্রকল্পে বরাদ্দ কমানো হয়েছে ৯৫ শতাংশের বেশি।
খাতা অনুযায়ী বরাদ্দের উত্থান-পতন
আরএডিপিতে সামাজিক ও সেবা খাতের চেয়ে অবকাঠামো সংস্কার ও স্থানীয় উন্নয়নে বেশি জোর দেওয়া হয়েছে:
- বৃদ্ধি: পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ে বরাদ্দ বেড়েছে সর্বোচ্চ ২৮ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার বিভাগে ৮ শতাংশ।
- হ্রাস: স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণে বরাদ্দ কমেছে ৭৭ শতাংশ, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে ৭৩ শতাংশ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষায় ৫৫ শতাংশ। এছাড়া কৃষিতেও ৩৬ শতাংশ বরাদ্দ কমানো হয়েছে।
থমকে যেতে পারে সংযোগ ও শিক্ষা প্রকল্প
রেলপথ ও সড়ক যোগাযোগ খাতে বরাদ্দ ব্যাপক হ্রাসের ফলে উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের সড়ক উন্নয়নের গতি মন্থর হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চট্টগ্রাম-দোহাজারী রেললাইন প্রকল্পে বরাদ্দ ৯৮ শতাংশ কমিয়ে দেওয়ায় এই প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এছাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের খাদ্য কর্মসূচিতে বরাদ্দ ৫০ শতাংশ কমানো হয়েছে, যা শিশু পুষ্টির ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পরিকল্পনা কমিশনের যুক্তি
পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, রাজনৈতিক বিবেচনায় নেওয়া কম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর বরাদ্দ কমিয়ে প্রকৃত জনকল্যাণমুখী ও পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অর্থায়ন নিশ্চিত করতেই এই কাটছাঁট করা হয়েছে। অহেতুক ব্যয় কমিয়ে বৈদেশিক ঋণের নির্ভরতা ধাপে ধাপে কমিয়ে আনাই অন্তর্বর্তী সরকারের লক্ষ্য।














