নতুন বছর ২০২৬ শুরু হয়েছে বিশ্ব রাজনীতিতে বড় ধরনের আলোড়ন দিয়ে। ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তাঁর স্ত্রীর গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে যে বছর শুরু হয়েছে, তাতে বৈশ্বিক রাজনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা ইস্যুতে অস্থিরতা আরও বাড়বে বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। এর প্রভাব পড়ছে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমারেও।
২০২৬ সালের শুরুতেই মিয়ানমারের সামরিক সরকার দেশটির স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে হাজারো বন্দিকে সাধারণ ক্ষমা দিয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, চলতি বছর এমন আরও বড় পরিসরের বন্দিমুক্তি দেখা যেতে পারে, যার মধ্যে রাজনৈতিক বন্দির সংখ্যাও বাড়তে পারে।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে মিয়ানমারের নির্বাচন ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল দেশটি। ধারণা করা হচ্ছে, সামরিক বাহিনী সমর্থিত দলই নির্বাচনে জয়ী হয়ে মার্চের মধ্যে সরকার গঠন করবে। অনেকের মতে, এটি মূলত বিদ্যমান ক্ষমতার ধারাবাহিকতাই নিশ্চিত করবে এবং সামরিক শাসন নতুন রূপে দীর্ঘায়িত হবে।
নির্বাচনের প্রথম ধাপকে স্বাগত জানিয়েছে চীন। বেইজিং মিয়ানমারে স্থিতিশীলতা ও জাতীয় পুনর্মিলনের আশা প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, ২০২৬ সালে মিয়ানমারের রাজনীতিতে চীনের প্রভাব আরও বাড়তে পারে এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের আওতায় স্থগিত থাকা প্রকল্পগুলো আবার সক্রিয় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রও মিয়ানমার ইস্যুতে অবস্থান স্পষ্ট করেছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী সহিংসতা বন্ধ, মানবিক সহায়তা নিশ্চিত, বন্দিমুক্তি এবং সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর জোর দিয়েছে ওয়াশিংটন।
চলতি বছরে আরও বন্দিমুক্তির পাশাপাশি নতুন সরকার গঠনের সম্ভাবনার কথাও উঠে আসছে। তবে সামরিক বাহিনীর প্রধান মিন অং হ্লাইং ভবিষ্যতে কী ভূমিকা পালন করবেন, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। দেশটির ভেতরেই তাঁর সরে যাওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।
মিয়ানমারে সশস্ত্র সংঘাতও ২০২৬ সালে বড় ইস্যু হয়ে থাকবে। সেনাবাহিনী ও বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীর মধ্যে সংঘর্ষ এবং সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি নিয়ে নজর থাকবে আন্তর্জাতিক মহলের। সীমান্ত এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠায় চীন সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে এবং নির্বাচনের পর কিছু এলাকায় যুদ্ধবিরতির উদ্যোগ দেখা যেতে পারে।
এদিকে সামরিক সরকারের বৈধতা সংকট আরও তীব্র হচ্ছে। নতুন সরকার জাতিসংঘে মিয়ানমারের আসন পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে পারে, যে আসন বর্তমানে বিরোধীদের প্রতিনিধির কাছে রয়েছে।
অর্থনৈতিক দিক থেকে মিয়ানমারের ভবিষ্যৎ চিত্র বেশ হতাশাজনক। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চে সংঘটিত বড় ভূমিকম্পে দেশটির প্রায় ১১ বিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে। এর ফলে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ কমে গেছে এবং নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বেড়েছে।
দেশটিতে দক্ষ জনশক্তির বড় একটি অংশ বিদেশে চলে যাচ্ছে বা বাধ্য হয়ে কম উৎপাদনশীল খাতে কাজ করছে। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ প্রায় ৭৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠানে বিদ্যুৎ বিভ্রাট নিয়মিত সমস্যায় পরিণত হয়, যা শিল্পখাতকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অনেকে এখন মিয়ানমারকে ব্যর্থ রাষ্ট্রের বদলে প্রতারণা নির্ভর অর্থনীতির দেশ হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। অবৈধ কার্যক্রম দমনে অভিযান হলেও মূল নেটওয়ার্কগুলো ভেঙে পড়ছে না, বরং স্থান পরিবর্তন করছে। যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সাম্প্রতিক নিষেধাজ্ঞা বৈধ বাণিজ্যকেও চাপে ফেলেছে।
আসিয়ান ও জাতিসংঘের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সামরিক সমর্থিত সরকারের প্রতি আসিয়ানের প্রতিক্রিয়া বরাবরের মতোই দুর্বল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তা কমে যাওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। চলতি বছর আসিয়ানের সভাপতির দায়িত্বে থাকা ফিলিপাইনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
সব মিলিয়ে পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে সংকটের ভেতর দিয়ে যাওয়া মিয়ানমারের জনগণের জন্য ২০২৬ সালও সহজ হবে না বলেই ধারণা করা হচ্ছে। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, সংঘাত ও অর্থনৈতিক দুরবস্থার মধ্যে দেশটি আরও ব্যস্ত ও চ্যালেঞ্জপূর্ণ একটি বছরে প্রবেশ করেছে।















