বিএনপি ও জামায়াতকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে দ্বি-মেরুকরণ; এনসিপি-জামায়াত জোট নিয়ে বাড়ছে ধোঁয়াশা, মাঠের বাইরে ১৪ দল
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নাটকীয় পরিবর্তনের জোয়ার শুরু হয়েছে। দীর্ঘদিনের মিত্রদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হওয়া, ছোট দলগুলোর বড় দলে বিলীন হওয়া এবং নতুন নতুন জোটের সমীকরণ ভোটের মাঠকে এক ‘অভূতপূর্ব’ পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে বিএনপির নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী ধারা, অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পাল্টা মেরুকরণ—সব মিলিয়ে নির্বাচনী লড়াই এখন বহুমুখী চ্যালেঞ্জের মুখে।
২৮ ডিসেম্বর ২০২৫ | সকাল ১১:৩০ মিনিট
সালমান তারেক শাকিল | রাজনৈতিক প্রতিবেদক
নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে শুরু হয়েছে ‘অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই’। আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে এবারের নির্বাচনকে ‘একপক্ষীয়’ হওয়ার ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে অন্তর্বর্তী সরকার ও দলগুলো ভোটার উপস্থিতি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। তবে মাঠের মূল লড়াই এখন দুটি প্রধান ধারাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে।
বিএনপির ‘ধানের শীষ’ শিবিরে ভিড়
দীর্ঘদিনের যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গীরা অনেকেই এবার নিজেদের দলীয় প্রতীক ছেড়ে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আরপিও’র জটিলতা এবং বিজয় নিশ্চিত করার কৌশলী পদক্ষেপে দল পরিবর্তন করছেন অনেকেই:
- এলডিপি-র রেদোয়ান আহমেদ, এনডিপি-র ববি হাজ্জাজ এবং গণঅধিকার পরিষদের রাশেদ খান ইতিমধ্যে বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষের মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন।
- গণতন্ত্র মঞ্চের শরিক দলগুলো (নাগরিক ঐক্য, গণসংহতি আন্দোলন) নিজ নিজ প্রতীকে নির্বাচন করলেও তাদের আসনে বিএনপির পূর্ণ সমর্থন থাকছে।
- বিএনপি ইতিমধ্যে ২৭২টি আসনে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামসহ শরিকদের জন্য ২৮টি আসন ছেড়েছে।
জামায়াত ও এনসিপির ‘সম্ভাব্য’ মেরুকরণ
নির্বাচনী আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সম্ভাব্য জোট। যদিও এনসিপির ভেতরে এই জোট নিয়ে তীব্র অসন্তোষ ও পদত্যাগের হিড়িক পড়েছে, তবুও আলোচনা থামেনি।
- জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিসসহ ৮টি দলের একটি ব্লক সক্রিয় রয়েছে।
- গুঞ্জন রয়েছে, এই জোট থেকে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামকে ‘প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী’ হিসেবে উপস্থাপন করা হতে পারে। তবে বাম প্রগতিশীল দলগুলো এই মেরুকরণকে এনসিপির জন্য ‘রাজনৈতিক ঝুঁকি’ হিসেবে দেখছে।
কোণঠাসা ১৪ দল ও বাম মোর্চা
বিগত সরকারের শরিক দলগুলো—জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও সাম্যবাদী দল—নির্বাচনে অংশগ্রহণের ইচ্ছা থাকলেও মাঠের পরিস্থিতিতে এখনো অনিশ্চিত। তারা এখনো নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করতে পারেনি। অন্যদিকে সিপিবি ও বাসদ-এর নেতৃত্বে ‘গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্ট’ এককভাবে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
তৃতীয় পক্ষ ও মাজারপন্থী দলগুলো
নির্বাচনের তৃতীয় পক্ষ হিসেবে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে জাতীয় পার্টির (জিএম কাদের অংশ)। তবে ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ না পেলে তারা নির্বাচন বর্জনের হুমকি দিয়ে রেখেছে। এছাড়া সুপ্রিম পার্টির চেয়ারম্যান সৈয়দ সাইফুদ্দিন আল হাসানীর নেতৃত্বে একটি সুন্নি-মাজারপন্থী বৃহত্তর জোট গঠনের প্রক্রিয়া চলছে, যারা প্রায় ২০০ আসনে প্রার্থী দেওয়ার পরিকল্পনা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচনে ভোটারের অংশগ্রহণ বাড়ানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যদি এনসিপি ও জামায়াতের জোট চূড়ান্ত হয়, তবে ভোটের সমীকরণ পুরোপুরি বদলে যেতে পারে। তবে দলগুলোর এই ‘ভুতুড়ে’ পরিবর্তন এবং আদর্শিক বিচ্যুতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যে কী প্রভাব ফেলে, তা দেখার জন্য ১২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
















