সুদানের দারফুর অঞ্চলে সংঘাত শুরুর সময় লেখকের বয়স ছিল মাত্র ১৩ বছর। তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার না থাকলেও সংবাদপত্র ও রেডিওতে মানবিক বিপর্যয়ের খবর তাঁকে গভীরভাবে নাড়া দেয়। সেই সময় থেকেই মানুষের পাশে দাঁড়ানোর তাগিদ অনুভব করেন তিনি, যা পরবর্তী সময়ে তাঁকে চিকিৎসক হয়ে সংঘাত ও দুর্যোগপূর্ণ এলাকায় কাজ করার পথে নিয়ে আসে।
চলতি ডিসেম্বরের প্রথম দুই সপ্তাহ তিনি সুদানের উত্তরাঞ্চলীয় রাজ্যের আল-দাব্বায় অবস্থিত অভ্যন্তরীণ বাস্তুচ্যুত মানুষের একটি শিবিরে একটি বেসরকারি সংস্থার সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেন। এই সময়টিতে শিবিরের জনসংখ্যা দ্রুত বেড়ে যায়। মাত্র দুই সপ্তাহে সেখানে মানুষের সংখ্যা দুই হাজার থেকে বেড়ে দশ হাজার ছাড়িয়ে যায়। নতুন করে আসা মানুষদের জন্য পর্যাপ্ত খাবার, পানি, ওষুধ ও শৌচাগারের সংকট প্রকট হয়ে ওঠে।
তবে এই সংকটের মধ্যেও লেখক বারবার প্রত্যক্ষ করেন সুদানি মানুষের অসাধারণ সাহস, উদারতা ও মানবিকতা। বাস্তুচ্যুত মানুষদের পাশাপাশি স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক ও কর্মীরাও সীমিত সামর্থ্য নিয়ে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছিলেন।
শিবিরে দেখা হওয়া মানুষের গল্পগুলো হৃদয়বিদারক। ১৫ বছর বয়সী এক কিশোরী, যাকে এল-ফাশের থেকে আল-দাব্বায় পৌঁছাতে ২১ দিন সময় লেগেছে। সে তখন দশ সপ্তাহের অন্তঃসত্ত্বা। চিকিৎসার প্রয়োজনে তাকে হাসপাতালে পাঠানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছিল। কথোপকথনের একপর্যায়ে জানা যায়, সে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছিল।
আরেকজন নারী পাঁচ সন্তানের মা। এল-ফাশের থেকে পালিয়ে আসার পথে তিনি স্বামীকে হারান। শারীরিকভাবে গুরুতর অসুস্থ হওয়ায় তাঁর রক্ত সঞ্চালনের প্রয়োজন হলেও সন্তানদের মানসিক অবস্থার কথা ভেবে হাসপাতালে যেতে তিনি ভীত ছিলেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সহযোগিতায় চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়।
একজন গর্ভবতী নারী চার সপ্তাহের দীর্ঘ ও বিপজ্জনক যাত্রায় স্বামী ও দুই সন্তানকে হারান। অনাহার, পানির অভাব ও দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে বেঁচে থাকা এই নারী শিবিরে এসে সামান্য চিকিৎসা সহায়তা পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। তিনি তাঁর অনাগত সন্তানের নাম চিকিৎসকের নামে রাখার কথা জানান, যা লেখককে গভীরভাবে আবেগাপ্লুত করে।
শিবিরে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করা এক বয়োজ্যেষ্ঠ নারী নিজের অল্প কয়েকটি জিনিসের মধ্যেও অন্যদের জন্য নামাজের জায়নামাজ, খাবার ও চা ভাগ করে দেন। তাঁর ঘরটিই যেন আশ্রয় ও নিরাপত্তার প্রতীক হয়ে উঠেছিল।
এ ছাড়া স্থানীয় অনুবাদক ও স্বেচ্ছাসেবকদের আত্মত্যাগও লেখকের মনে গভীর ছাপ ফেলে। যুদ্ধ শুরু হলে অনেকে পরিবারকে নিরাপদ স্থানে পাঠিয়ে নিজেরা দেশে থেকে মানুষের সেবা চালিয়ে যাচ্ছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়েই।
বর্তমানে সুদান বিশ্বের সবচেয়ে বড় মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটির এক-তৃতীয়াংশ মানুষ বাস্তুচ্যুত, অর্ধেক মানুষ খাদ্য সংকটে ভুগছে এবং বহু এলাকায় দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অথচ আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজনের এক-তৃতীয়াংশেরও কম।
লেখকের মতে, এই সংকটে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বারবার সুদানের জনগণকে হতাশ করেছে। তিনি মনে করেন, আরও দায়িত্বশীল ও মানবিক ভূমিকা নেওয়া জরুরি। বাস্তুচ্যুত নারী, শিশু ও সাধারণ মানুষেরা এর চেয়ে অনেক ভালো ভবিষ্যৎ পাওয়ার যোগ্য।
















