আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইথিওপিয়াকে ‘আফ্রিকার উঠতি ড্রাগন’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে। একসময় দুর্ভিক্ষ, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক অস্থিরতার প্রতীক হিসেবে পরিচিত দেশটি এখন আফ্রিকার সম্ভাবনাময় অর্থনীতিগুলোর একটি। রাষ্ট্রীয় উদ্যোগনির্ভর উন্নয়ন কৌশল এবং অবকাঠামোতে ব্যাপক সরকারি বিনিয়োগ ইথিওপিয়ার এই অগ্রযাত্রার মূল চালিকাশক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ইথিওপিয়ার উন্নয়ন মডেল শুধু আফ্রিকার দেশগুলোর জন্য নয়, বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষার সুযোগ তৈরি করেছে। প্রশ্ন উঠছে, কীভাবে দীর্ঘদিনের সংকট পেছনে ফেলে ইথিওপিয়া ধারাবাহিক উচ্চ প্রবৃদ্ধি অর্জন করল এবং বাংলাদেশ সেই অভিজ্ঞতা থেকে কী শিখতে পারে।
ইথিওপিয়ার অর্থনীতি ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিনির্ভর হলেও সাম্প্রতিক সময়ে পোশাক, টেক্সটাইল, চামড়া ও হালকা শিল্প খাতে বিনিয়োগ বেড়েছে। হাওয়াসা ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কসহ একাধিক শিল্পাঞ্চল বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করছে। পাশাপাশি সড়ক, রেল, বিদ্যুৎ ও টেলিযোগাযোগ খাতে বড় আকারের সরকারি বিনিয়োগ দেশটির অর্থনীতিতে গতি এনেছে। তরুণ জনসংখ্যা শিল্প উৎপাদনশীলতার নতুন সম্ভাবনাও তৈরি করছে।
ইথিওপিয়ার উন্নয়ন কৌশলের অন্যতম দিক হলো রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় পরিচালনা করা। বিদ্যুৎ, টেলিকম, ব্যাংকিং, বিমান পরিবহনসহ কৌশলগত খাতগুলো রাষ্ট্রের হাতে থাকলেও দৈনন্দিন পরিচালনায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ সীমিত রাখা হয়েছে। এর ফলে এসব প্রতিষ্ঠান লাভজনক ও প্রতিযোগিতামূলক হতে পেরেছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল। রাষ্ট্র নিজ উদ্যোগে শিল্প পার্ক গড়ে তুলেছে এবং বিনিয়োগকারীদের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করেছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও ভবিষ্যতমুখী ভিশনের মাধ্যমে ইথিওপিয়া ২০৩০ সালকে সামনে রেখে শিল্পায়নের স্পষ্ট রোডম্যাপ নির্ধারণ করেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে চিত্র কিছুটা ভিন্ন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগনির্ভর অর্থনৈতিক কাঠামো থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানে অদক্ষতা, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এবং প্রযুক্তিগত পশ্চাৎপদতা প্রকট হয়েছে। পাটকল, চিনিকল, রেল ও রাষ্ট্রীয় শিল্পকারখানার বড় অংশই লোকসানে চলছে এবং প্রতিবছর সরকারি ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল।
তবে সব ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি হতাশাজনক নয়। সাম্প্রতিক সময়ে কিছু অবকাঠামো প্রকল্প, অর্থনৈতিক অঞ্চল, রেল আধুনিকায়ন এবং ডিজিটাল রূপান্তর রাষ্ট্রীয় অংশগ্রহণের ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইথিওপিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশ যদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলোতে পেশাদার ব্যবস্থাপনা, করপোরেট শৃঙ্খলা ও স্বশাসন নিশ্চিত করতে পারে, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠান আবারও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তি হতে পারে।
বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, কৌশলগত খাতে রাষ্ট্রীয় মালিকানা বজায় রেখে দক্ষতা বাড়ানো, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে রাষ্ট্রের নেতৃত্ব, বৈশ্বিক প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ অংশীদারিত্ব এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ—এই ক্ষেত্রগুলোতে ইথিওপিয়ার মডেল বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে।
বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলোর একটি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও ভোক্তা বাজারের শক্ত ভিত্তির সঙ্গে যদি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগগুলোকে আধুনিক ও কার্যকর করা যায়, তাহলে শিল্পায়নের নতুন ধাপ শুরু হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ইথিওপিয়া প্রমাণ করেছে সঠিক নীতি, দক্ষ ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ লোকসানের বোঝা নয়, বরং জাতীয় সম্পদে পরিণত হতে পারে। একই পথে এগোতে পারলে বাংলাদেশের সামনেও নতুন অর্থনৈতিক দিগন্ত উন্মোচিত হতে পারে।
















