মোগাদিশুর বাতাসে আজও ভাসে আশার সঙ্গে শঙ্কার গন্ধ। গত ২৫ বছরে সোমালিয়ার রাজনৈতিক রূপান্তরগুলো কাকতালীয়ভাবে আসেনি; আন্তর্জাতিক সহায়তা, চাপ ও মধ্যস্থতার হাত ধরে দেশটি বারবার ভেঙে পড়া থেকে নিজেকে সামলে নিয়েছে। কিন্তু ২০২৬ সালের নির্বাচনের পথে দাঁড়িয়ে সোমালিয়া এখন এক বিপজ্জনক মোড়ে। ক্ষমতাসীন সরকারের একতরফা সংস্কার উদ্যোগ, যা গণতন্ত্রের ভাষায় মোড়ানো, ধীরে ধীরে দেশটিকে একটি গভীর বৈধতার সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
সর্বজনীন ভোটাধিকার—এক ব্যক্তি এক ভোট—এটি এমন এক স্বপ্ন, যা প্রায় সব সোমালির হৃদয়ে লালিত। কিন্তু বাস্তবতা কঠিন। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে তীব্র মতভেদ, নিরাপত্তাহীনতা, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসা এবং অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা মিলিয়ে নির্ধারিত সময়ে এই স্বপ্ন বাস্তবায়ন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে।
রাজনৈতিক ঐকমত্য, প্রাতিষ্ঠানিক প্রস্তুতি কিংবা ন্যূনতম নিরাপত্তা নিশ্চয়তা ছাড়া সর্বজনীন ভোটাধিকার চাপিয়ে দিলে গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না; বরং ক্ষমতা কুক্ষিগত হয় এবং ভাঙনের আশঙ্কা বাড়ে। সমাধানের পথে না হেঁটে সরকার একতরফাভাবে সংবিধান পরিবর্তন করেছে, নিজেদের সুবিধামতো নির্বাচন ও রাজনৈতিক দলসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করেছে এবং শাসক দলের সমর্থিত কমিশনারদের দিয়ে নির্বাচন কমিশন সাজিয়েছে—যা অনেকের চোখে ক্ষমতা দখলেরই আরেক নাম।
এই প্রেক্ষাপটে দেশের ভেতরের বিভাজন আরও স্পষ্ট। ১৯৯১ সালে বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করা সোমালিল্যান্ড আজও স্বীকৃতির অপেক্ষায়। পন্টল্যান্ড ও জুবাল্যান্ডসহ বহু ফেডারেল রাজ্যের নেতা এবং জাতীয় পর্যায়ের বিরোধীরা সরকারের পথ প্রত্যাখ্যান করে একটি নতুন রাজনৈতিক জোট গঠন করেছে। তারা স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে, সরকার না শুনলে তারা সমান্তরাল রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় হাঁটবে।
নিরাপত্তার চিত্রও আশাব্যঞ্জক নয়। আল-শাবাব এখনো দেশের নানা অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করে এবং রাজধানীর কাছাকাছি হামলা চালানোর সক্ষমতা রাখে। সম্প্রতি ভিলা সোমালিয়ার পাশেই একটি কারাগারে হামলা সেই বাস্তবতাই স্মরণ করিয়ে দিয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো নির্বাচন হবে ঝুঁকিপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই সংকটময় সময়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকা অপরিহার্য। ২০২৬ সালের রূপান্তরের জন্য সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পথ হতে পারে একটি উন্নত পরোক্ষ নির্বাচন ব্যবস্থা। সোমালিয়া গত আড়াই দশকে পাঁচবার এই মডেলে নির্বাচন করেছে। এটি আদর্শ না হলেও বর্তমান বাস্তবতায় কার্যকর হতে পারে, যদি তা সময়োপযোগী, প্রতিযোগিতামূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়।
সরকারের বর্তমান মেয়াদ শেষ হচ্ছে ২০২৬ সালের ১৫ মে। ইতোমধ্যে মেয়াদ বাড়ানোর গুঞ্জন উঠেছে, যা নতুন সংকট ডেকে আনতে পারে। রাজনৈতিক সমঝোতার ভিত্তিতে সীমিত প্রযুক্তিগত সময় বাড়ানো যেতে পারে, তবে তা কেবল নির্বাচন প্রক্রিয়া চলমান থাকলেই গ্রহণযোগ্য হবে।
এই উন্নত পরোক্ষ ব্যবস্থায় প্রতিটি আসনের জন্য নির্দিষ্টসংখ্যক প্রতিনিধি নির্বাচন, প্রবীণদের ভূমিকা এবং একাধিক এলাকার প্রতিনিধিদের যৌথ ভোটের মতো পদ্ধতি প্রস্তাব করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অতীতের ‘মালখিস’ বা সাজানো প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি ভাঙতে হবে, যাতে প্রতিযোগিতা হয় বাস্তব, প্রতীকী নয়।
নারী প্রতিনিধিত্বও বড় প্রশ্ন। সংসদের অন্তত ৩০ শতাংশ নারী আসন বাস্তবে নিশ্চিত করতে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি সোমালিল্যান্ডের আসনগুলো নিয়েও আলাদা ও বিশ্বাসযোগ্য সমাধান দরকার।
দুর্নীতিও এই ব্যবস্থার বড় শত্রু। ভোটার সংখ্যা বাড়ানো এবং একাধিক এলাকার প্রতিনিধি একসঙ্গে ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করলে ভোট কেনাবেচার সুযোগ কমতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
আগেও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় স্পষ্ট লাল রেখা টেনে দিয়েছিল—সরকারের একতরফা নির্বাচন নয়, বিরোধীদের সমান্তরাল পথও নয়। সেই নীতিতে ফেরার আহ্বান জানাচ্ছেন বিশ্লেষকরা। সোমালিয়ার মানুষ বারবার প্রমাণ করেছে, তারা গণতন্ত্র চায়। বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে কেবল ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতি ও বিভক্ত নেতৃত্ব।
এই সন্ধিক্ষণে নীরব থাকা মানে ইতিহাসের অর্জনগুলোকে ঝুঁকির মুখে ফেলা। সক্রিয়, ন্যায্য ও দায়িত্বশীল আন্তর্জাতিক সম্পৃক্ততাই পারে সোমালিয়াকে বৈধতার সংকট থেকে রক্ষা করতে এবং শান্তি ও রাষ্ট্রগঠনের দীর্ঘ যাত্রাকে নতুন করে আশার আলো দেখাতে।
















