নির্বাহী প্রভাবমুক্ত বিচার বিভাগ গড়ার ঐতিহাসিক সুযোগ বাস্তবায়নের পরীক্ষায় বাংলাদেশ
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের দীর্ঘ ব্যর্থতার ইতিহাস, সাম্প্রতিক অধ্যাদেশে পাওয়া সুযোগ এবং বাস্তবায়নে বিচারকদের নৈতিক সাহস ও রাজনৈতিক সদিচ্ছার অপরিহার্যতা নিয়ে বিশ্লেষণ।
স্বাধীন বিচারব্যবস্থা গড়ে তুলতে বাংলাদেশের ব্যর্থতার ইতিহাস আসলে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে না পারারই প্রতিচ্ছবি। সংবিধানে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগকে কার্যকরভাবে পৃথক করতে আমাদের লেগেছে প্রায় ৫৩ বছর। অবশেষে বিচার বিভাগের জন্য পৃথক সচিবালয় গঠনের অধ্যাদেশ জারি হওয়ায় সেই দীর্ঘ লড়াই একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপে পৌঁছেছে। তবে এই অর্জন কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে ভবিষ্যৎ বাস্তবায়নের ওপর।
নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার একটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রধান বিচারপতির অধীনস্থ পৃথক সচিবালয় ছাড়া বিচার বিভাগ কখনোই আইন মন্ত্রণালয় ও আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হতে পারত না। এ উদ্যোগের জন্য সরকারপ্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং বর্তমান প্রধান বিচারপতির ভূমিকা প্রশংসার দাবি রাখে।
তবে এই অগ্রগতির বিপরীতে একটি অস্বস্তিকর সত্য হলো—খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারগুলো, এমনকি জিয়াউর রহমান ও এইচ এম এরশাদের সামরিক সরকারও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠায় কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেয়নি। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সংবিধানের মৌলিক নীতিতে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কথা বলা থাকলেও কেন এই কাজটি করতে পাঁচ দশকের বেশি সময় লেগেছে?
এই বিলম্বের মূল কারণ দুটি—জবাবদিহিহীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং শক্তিশালী আমলাতন্ত্র, যারা কখনোই নিজেদের ক্ষমতাকে প্রশ্ন করতে পারে এমন স্বাধীন প্রতিষ্ঠান বিকাশে আগ্রহী ছিল না। শুরু থেকেই শক্তিশালী সরকারের নামে নির্বাহী বিভাগের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। এর ফলে আইনসভা ও বিচার বিভাগ ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়েছে।
সংসদ কখনোই স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে ওঠেনি। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের রাবার স্ট্যাম্পে পরিণত হওয়া সংসদে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান—এই তিন পদ একই ব্যক্তির হাতে থাকার কারণে ক্ষমতার ভারসাম্য পুরোপুরি নষ্ট হয়েছে। স্পিকারের ভূমিকা নিরপেক্ষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তিনি শাসক দলের অনুগত প্রতিনিধি হিসেবেই কাজ করেছেন।
এই বাস্তবতায় নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার শেষ ভরসা ছিল বিচার বিভাগ। কিন্তু সেটিকেও দুর্বল করতে নানা কৌশল নেওয়া হয়েছে। আমলাতন্ত্রের প্রভাব, রাজনৈতিক চাপ এবং বিচার বিভাগের অভ্যন্তরীণ আপসকামিতার কারণে নির্বাহী হস্তক্ষেপ বহু ক্ষেত্রেই প্রতিরোধের মুখে পড়েনি। বরং জামিন না দেওয়া, রিমান্ডের অপব্যবহার, এক ঘটনায় একাধিক মামলা গ্রহণ—এসবের মাধ্যমে রাজনৈতিক হয়রানি বৈধতা পেয়েছে।
বিচারকদের নৈতিক সাহসের ঘাটতিও এই সংকটকে গভীর করেছে। ইতিহাসে খুব কমই দেখা গেছে, কোনো বিচারক ন্যায়বিচার ক্ষুণ্ন হওয়ার প্রতিবাদে পদত্যাগ করেছেন। উল্টো বহু ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের অন্যায্য সিদ্ধান্তে বিচার বিভাগ নীরব সমর্থন দিয়েছে। এর চূড়ান্ত উদাহরণ ছিল প্রধান বিচারপতি এস. কে. সিনহার অপসারণ, যেখানে আপিল বিভাগের বিচারকদের ভূমিকা বিচার বিভাগের মর্যাদাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার যে কাঠামোগত ভিত্তি তৈরি করেছে, তা আইনে রূপান্তর করা হবে কি না—এটাই হবে ভবিষ্যৎ নির্বাচনে বিজয়ী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর প্রথম বড় পরীক্ষা। তবে শুধু আইন করলেই স্বাধীন বিচারব্যবস্থা নিশ্চিত হবে না। এর বাস্তব প্রয়োগ নির্ভর করবে বিচারকদের নৈতিক দৃঢ়তা, সাহস ও নাগরিক অধিকারের পক্ষে অবস্থানের ওপর।
যদি নির্বাহী বিভাগ নিজের সীমার মধ্যে থাকে, আইনসভা দলীয় আনুগত্যের বাইরে গিয়ে জবাবদিহিমূলক ভূমিকা পালন করে এবং বিচার বিভাগ ক্ষমতাসীনদের নয়, জনগণের পক্ষে দাঁড়ায়—তাহলেই বাংলাদেশে প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে। অন্যথায়, স্বাধীন বিচারব্যবস্থার স্বপ্ন নাগালের মধ্যেই থেকেও আবার ফসকে যেতে পারে।















