দেশের অর্থনীতি বর্তমানে জটিল সংকটের মুখে পড়েছে। ঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট, রফতানিতে ধারাবাহিক পতন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগকারীদের ওপর ব্যাপক চাপ দেখা দিচ্ছে। শেয়ারবাজারে লেনদেন কমে যাওয়া, মূল্যস্ফীতি বাড়া এবং বৈদেশিক ঋণের বোঝা দ্বিগুণ হওয়ার কারণে অর্থনীতির সামনে অন্তত নয়টি প্রধান সমস্যা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
রফতানি সংকট
রফতানি আয়ে টানা চার মাস ধরে পতনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইপিবির তথ্যে নভেম্বরে রফতানি আয় আগের বছরের একই মাসের তুলনায় প্রায় ২৩ মিলিয়ন ডলার কমে ৩৮৯ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। তৈরি পোশাকসহ বেশিরভাগ পণ্যে নেগেটিভ প্রবণতা রয়েছে — তৈরি পোশাকে রফতানি কমেছে ৫ শতাংশ। কৃষিপণ্য, ওষুধ, হোম টেক্সটাইল, পাটজাত ও চামড়া ইত্যাদি পণ্যের রফতানিতেও উল্লেখযোগ্য পতন দেখা গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ৭ আগস্ট থেকে বাংলাদেশের পণ্যের ওপর ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর প্রভাব স্পষ্ট — জুলাইয়ে অস্থায়ীভাবে বাড়তি আমদানি নিয়ে রফতানি বৃদ্ধি পেলেও আগস্ট থেকে ধারাবাহিকভাবে রফতানি কমেছে এবং সামনের মাসগুলোতেও চাপ চলতে পারে।
রফতানি পণ্যের চিত্র
ইপিবির বিশ্লেষণে দেখা গেছে: কৃষিপণ্য রফতানি ২৫%, ওষুধ ৯%, হোম টেক্সটাইল ৮%, পাটজাত পণ্য ১০% ও চামড়া ২২% কমে গেছে; যদিও চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের সামগ্রিক রফতানি কিছুটা বেড়েছে। নিটওয়্যারের অর্ডার হ্রাস বিশেষভাবে উদ্বেগের কারণ বলে ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন।
করের অতিরিক্ত চাপ ও রাজস্ব সংকট
ঋণের উচ্চ সুদ, জ্বালানি-বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি, আইনশৃঙ্খলার অনিশ্চয়তা ও দুর্বল পরিবহন ব্যবস্থা—এই সব কারণে ব্যবসা স্থবির। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসে লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়ে ১৭ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি করেছে। তবু আইএমএফ শর্ত মেটাতে এনবিআরের লক্ষ্য বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে, যা ব্যবসায়ীদের ওপর অতিরিক্ত করচাপে পরিণত হয়েছে। উদ্যোক্তারা কর ও উৎসে কর (টিডিএস), অগ্রিম আয়কর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, এ ধরনের চাপ ব্যবসার অগ্রগতিকে নিয়ন্ত্রণ করছে।
বিনিয়োগ ও ব্যবসায় পরিবেশ ঝুঁকিপূর্ণ
স্থানীয় বিনিয়োগ স্থবির এবং ব্যবসা নিবন্ধন ও সরকারি সেবা এখনও জটিল থাকায় উদ্যোক্তাদের ক্লান্তি বাড়ছে। বিজিএমইএ ও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিনিয়োগ পুনরুদ্ধারের জন্য কাঠামোগত সংস্কার ও প্রযুক্তির ব্যবহার অপরিহার্য।
পুঁজিবাজারে আস্থা কমে গেছে
শেয়ারবাজারে দরপতন, লেনদেন শীতল ও বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতা উদ্বেগের। গত ছয় মাসে লেনদেন উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে; ডিএসইতে লেনদেন মাত্র ২৬৭ কোটি টাকার কাছাকাছি নেমেছে এবং সূচকও ব্যাপকভাবে লস করেছে। নিয়ন্ত্রক ও আইনগত অস্থিরতা বাজারকে আরো দুর্বল করেছে।
অর্থনীতির ধীরগতি (পিএমআই)
নভেম্বরে পিএমআই ৫৪ পয়েন্টে নেমে এসেছে, যা আগের মাসের তুলনায় ৭.৮ পয়েন্ট কম। উৎপাদন, নির্মাণ, সেবা এবং কৃষিখাতের সম্প্রসারণের গতি সবখানে ধীরেছে—বিশেষ করে নতুন অর্ডার ও জমে থাকা অর্ডার দ্রুত কমেছে। এর ফলে মোট অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের গতি সংকুচিত হচ্ছে।
মূল্যস্ফীতি বাড়ছে
নভেম্বরে বার্ষিক মূল্যস্ফীতি পুনরায় বেড়ে ৮.২৯ শতাংশে পৌঁছেছে; খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি ৭.৩৬% এবং খাদ্যবহির্ভূত পণ্যে ৯.০৮%। শহর-গ্রামে উভয় এলাকায় মূল্যস্ফীতির চাপ অনুভূত হচ্ছে এবং তিন বছর ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে।
বৈদেশিক ঋণের দ্রুত বৃদ্ধি ও ঋণপরিশোধের চাপ
বিশ্বব্যাংকের তথ্যে গত পাঁচ বছরে বৈদেশিক ঋণ ৪২% বেড়েছে—২০২৪ সালের শেষে বৈদেশিক ঋণ ছিল ১০,৪৪৮ কোটি ডলার। ঋণ পরিষেবায় সুদ ও মুল (principal) পরিশোধ দ্বিগুণ হয়েছে (২০২০ থেকে ২০২৪ে ৩৭৩ থেকে ৭৩৫ কোটি ডলার)। বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর কারণে বিদেশি ঋণের বোঝা বাড়ছে এবং ঋণ পরিশোধের চাপ রফতানির তুলনায় অনেক বেশি; এটিই অন্য একটি বড় ঝুঁকি।
সমাধানের চ্যালেঞ্জ ও অভিভাবকীয় দিশা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে করের অতিরিক্ত চাপ কমানো, রাজস্ব আহরণে নতুন প্রযুক্তি ও কাঠামোগত সংস্কার, রফতানি বাজার বৈচিত্র্যকরণ, নতুন পণ্য ও প্রযুক্তি বিনিয়োগ ও ব্যবসা-সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। ঋণের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে ঋণ ব্যবস্থাপনার কৌশল এবং জবাবদিহিতার বৃদ্ধি প্রয়োজন। না হলে অর্থনীতির পুনর্জীবন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হবে।
সংক্ষেপে, রফতানি সংকট থেকে শুরু করে ঋণের বোঝা ও করচাপ—এই সব সমস্যা একসঙ্গে জটিল চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড়িয়েছে। সমন্বিত নীতিগত উদ্যোগ ছাড়া অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার সম্ভব হবে না, বলছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা।
















