জরিপে জনগণের আস্থা—নির্বাচনকালীন নিরাপত্তায় সেনাবাহিনীর দায়িত্ব আরও গুরুত্বপূর্ণ
জুলাই গণ–অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে নির্বাচনের নিরাপত্তা পর্যন্ত সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনমতের আস্থা বেড়েছে। শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনীকে বেসামরিক ম্যান্ডেটের অধীনে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে।
সেনাবাহিনীর কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চলমান আইনি প্রক্রিয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া নেতিবাচক মন্তব্য সাময়িকভাবে বাহিনীর মনোবলে প্রভাব ফেললেও সাম্প্রতিক জাতীয় জরিপে সেনাবাহিনী সম্পর্কে জনগণের আস্থা দৃশ্যমানভাবে বেড়েছে। জুলাই গণ–অভ্যুত্থান, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সেনাবাহিনীর সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রথম আলোর জরিপে পাওয়া ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া এই আস্থার প্রতিফলন।
এই আস্থার পেছনে দুইটি প্রধান কারণ রয়েছে। প্রথমত, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে দুর্যোগ মোকাবিলা ও রাষ্ট্রগঠনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পর্বে নিরপেক্ষ ও পেশাদার ভূমিকা রেখে সেনাবাহিনী জনগণের বিশ্বাস অর্জন করেছে। দ্বিতীয়ত, গত দেড় দশকে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতার মধ্যেও সেনাবাহিনী গণ–অভ্যুত্থানের সময় জনগণের ওপর গুলি চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়ে এবং জনতার পাশে দাঁড়িয়ে তাদের সাংগঠনিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরায় প্রমাণ করেছে।

অভ্যুত্থানোত্তর সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সেনাবাহিনী রক্ষণশীল ও সংযত থেকে দায়িত্ব পালন করেছে—যা পূর্ববর্তী কিছু অভিযানের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন। যদিও প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি, তবে সার্বিক নিরাপত্তা একটি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় রাখা সম্ভব হয়েছে।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সম্ভাব্য নিরাপত্তাঝুঁকি
আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
- জুলাইয়ের ঘটনা চলাকালে খোয়া যাওয়া অস্ত্র ও গোলাবারুদ এখনো পুরোপুরি উদ্ধার হয়নি।
- বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় প্রার্থীদের মধ্যে উত্তেজনা ও সহিংসতার ঝুঁকি বাড়ছে।
- অপতথ্য, ভুয়া খবর, এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে বিভিন্ন গোষ্ঠীর অপপ্রচার পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করতে পারে।
- দেশের দক্ষিণ–পূর্ব সীমান্ত—পার্বত্য চট্টগ্রাম ও রাখাইন–সংলগ্ন অঞ্চল—নির্বাচনী সময়ে অতিরিক্ত ঝুঁকিতে থাকবে। এ সুযোগে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
সবচেয়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি হবে যদি নির্বাচন সহিংসতা রাজনৈতিক গুপ্তহত্যার পর্যায়ে গড়ায়। তখন কিছু দল নির্বাচন বর্জনের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে—যা জাতীয় স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি।
সেনাবাহিনীর করণীয়—লেখকের সুপারিশ
১. বেসামরিক কর্তৃত্বের অধীনে কাজ
সেনাবাহিনী নির্বাচন কমিশনের সার্বিক নেতৃত্বে এবং সুস্পষ্ট লিখিত ম্যান্ডেট অনুযায়ী দায়িত্ব পালন করবে। নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা তাদের মূল ভূমিকা।
২. কৌশলগত যোগাযোগ জোরদার
উদ্ভূত বিভ্রান্তি দূর করতে নির্বাচন কমিশনকে তথ্য আদান–প্রদানের দক্ষতা বাড়াতে হবে।
৩. গোয়েন্দা সমন্বয় বৃদ্ধি
জাতীয় গোয়েন্দা সমন্বয় কমিটিকে নির্বাচন কমিশনের আওতায় এনে সব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে আগাম নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. দক্ষিণ–পূর্বাঞ্চলের বিশেষ নজরদারি
পার্বত্য ও সীমান্ত অঞ্চলে মোতায়েন বাহিনী বদলানোর আগে সর্বোচ্চ সতর্কতা জরুরি।
৫. অস্ত্র উদ্ধার অভিযান
নির্বাচনের আগে সীমিত পরিসরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা প্রয়োজন, যা প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে কাজ করবে।















