মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও বিনিয়োগ স্থবির, ব্যাংক খাত দুর্বল—পুনরুদ্ধার নির্ভর রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের ওপর
রেমিট্যান্স প্রবাহ ও রিজার্ভ পরিস্থিতি স্বস্তিদায়ক হলেও রপ্তানি আয়ে বড় ধরনের অস্থিরতা, বিনিয়োগ স্থবিরতা ও দুর্বল ব্যাংক খাত অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে। নির্বাচন ঘিরে অনিশ্চয়তা বাড়ছে; অর্থনীতি পুনরুদ্ধার নির্ভর করবে রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও সংস্কারের ধারাবাহিকতার ওপর।
দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি এখনো বহুস্তরের ঝুঁকির মুখে। ব্যবসায়িক আস্থার সংকট, নতুন বিনিয়োগে স্থবিরতা, ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুরতা ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সামগ্রিক পুনরুদ্ধারে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ অবস্থায় আসন্ন জাতীয় নির্বাচন পণ্যবাজারে নতুন ধরনের চাপ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (জিইডি)।
নভেম্বরের ইকোনমিক আপডেটে বলা হয়েছে, আগামী নির্বাচনে স্পষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশনা পাওয়া গেলে এবং নতুন সরকার সংস্কার কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা বজায় রাখলে অর্থনৈতিক গতি ফের জোরদার হতে পারে। বিশেষত ব্যবসায়িক পরিবেশ, ব্যাংকখাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা ও রাজস্ব কাঠামো সংস্কারে অগ্রগতি জরুরি।
এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সর্বশেষ আউটলুকে ২০২৫–২৬ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ হতে পারে বলে জানানো হয়েছে। রেমিট্যান্স ও তৈরি পোশাক রপ্তানি অর্থনীতির মূল ভরসা হিসেবে থাকলেও ভোক্তা আস্থা নেমে যাওয়ায় অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল। অনেক উদ্যোক্তা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় নতুন বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছেন।

অক্টোবরে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি কমে দাঁড়িয়েছে ৮.১৭ শতাংশে—যদিও এটি এখনো লক্ষ্য মাত্রার ওপরে। ব্যাংকখাতে আমানত প্রবৃদ্ধি স্থিতিশীল হলেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রায় স্থবির। উচ্চ সুদহার, সতর্ক ঋণনীতি, বিনিয়োগ সংকট এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা এ স্থবিরতা বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে সরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪.৪৫ শতাংশে, যা বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর সরকারের নির্ভরতা বাড়িয়ে ‘ক্রাউডিং আউট’ পরিস্থিতি তৈরি করছে।
রপ্তানি আয়ে স্পষ্ট অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বছরের শুরুতে বড় পতনের পর জুলাইয়ে রপ্তানি কিছুটা ঘুরে দাঁড়ালেও পুনরায় নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা গেছে। অক্টোবরে আয় দাঁড়িয়েছে ৩.৮২ বিলিয়ন ডলার—আগের মাসের তুলনায় ভালো হলেও সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে অনেক কম। বিনিয়োগের অন্যতম সূচক ক্যাপিটাল মেশিনারি আমদানি তীব্রভাবে কমে যাওয়া অর্থনীতির স্থবির প্রবৃদ্ধির ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজস্ব কাঠামোতেও দুর্বলতা স্পষ্ট। এনবিআর অক্টোবর মাসে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৮,০০০ কোটি টাকার বেশি ঘাটতি দেখিয়েছে। এডিপি বাস্তবায়ন কিছুটা বেড়েছে, তবে বরাদ্দ কমে যাওয়া ও প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি স্থায়ী সমস্যাকেই নির্দেশ করছে।

এদিকে রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহ অর্থনীতির বাহ্যিক খাতকে তুলনামূলক স্বস্তিতে রেখেছে। গত বছর নভেম্বর থেকে এ বছর অক্টোবর পর্যন্ত রিজার্ভ ২৪.৩৫ বিলিয়ন থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩২.৩৪ বিলিয়ন ডলারে।
ব্যবসায়ীদের দাবির মূল কেন্দ্রে রয়েছে শক্তি সংকট, উচ্চ সুদহার ও নীতিগত অনিশ্চয়তা। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত উৎপাদন বজায় রাখতে পারছে না, বিশেষত ক্ষুদ্র শিল্পগুলো চরম চাপের মুখে আছে।
সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন মনে করেন, স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশ ছাড়া অর্থনীতির পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদ দীর্ঘ হলে অর্থনীতির ক্ষতি আরও বাড়বে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেমিট্যান্স শক্ত অবস্থানে থাকলেও রপ্তানি আয়, বিনিয়োগ ও ব্যাংক খাতের দুর্বলতা সামগ্রিক অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলছে। স্পষ্ট রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা ও কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া পূর্ণ পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়।















