যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও আলোচনার কেন্দ্রে। এবার তিনি আক্রমণের নিশানা করেছেন মিনেসোটার বৃহৎ সোমালি সম্প্রদায়কে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে তিনি একের পর এক কটূক্তি ছুঁড়ে দিয়েছেন এই অভিবাসী জনগোষ্ঠীর দিকে, আর এরই মাঝে ফেডারেল কর্তৃপক্ষ প্রস্তুত হচ্ছে রাজ্যের বিভিন্ন সোমালি এলাকায় ব্যাপক ধরপাকড় চালানোর।
মঙ্গলবার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ট্রাম্পের ভাষা আরও কঠোর হয়ে ওঠে। তিনি জানান, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে সোমালিদের দেখতে চান না এবং দাবি করেন যে তারা দেশকে কোনো অবদান দিচ্ছে না, বরং শুধু সহায়তার উপর নির্ভর করছে। এসব অভিযোগের পক্ষে তিনি কোনো প্রমাণ দেননি। তার কথায় ক্ষোভ, অবজ্ঞা আর বৈরিতার তীব্র এক ঢেউ থাবা বসিয়েছিল উপস্থিতদের মনে।
এর আগেও ট্রাম্প সোমালি সম্প্রদায়কে নিয়ে এমন মন্তব্য করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বা প্রথম দফা প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তিনি একই ধরনের অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার করেছেন। কেবল তাই নয়, মিনেসোটার কংগ্রেসওম্যানে ইলহান ওমরকেও তিনি বহুবার অপমান করেছেন—যিনি নিজেও সোমালি বংশোদ্ভূত একজন মার্কিন নাগরিক।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ১৯টি উচ্চ ঝুঁকির দেশের অভিবাসন কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত করেছে সাম্প্রতিক নিরাপত্তা ঘটনার পর। এরই পাশাপাশি আগামী বছরের জন্য শরণার্থী গ্রহণের সংখ্যা কমিয়ে আনা হয়েছে ৭৫০০-তে—১৯৮০ সালের পর এ সংখ্যা সর্বনিম্ন। সাদা দক্ষিণ আফ্রিকানদের প্রতি বরং বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
মার্কিন গণমাধ্যম জানায়, শিগগিরই মিনিয়াপলিস–সেন্ট পল অঞ্চলের সোমালি অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ইমিগ্রেশন অ্যান্ড কাস্টমস এনফোর্সমেন্ট বা আইসিই অভিযান চালাবে। প্রায় ১০০-এর মতো আইসিই এজেন্ট সেখানে মোতায়েন হওয়ার কথা। আশঙ্কা করা হচ্ছে, যাদের বৈধতার প্রক্রিয়া চলমান, তারাও এই ধরপাকড়ে পড়তে পারেন। এ নিয়ে পুরো সম্প্রদায়ে ছড়িয়ে পড়েছে শঙ্কা, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা।
মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়াল্জ এই পরিকল্পনাকে তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, অপরাধ মোকাবিলায় সহায়তা স্বাগত, কিন্তু নিরীহ অভিবাসীদের লক্ষ্য করে এ ধরনের ‘প্রচারমূলক অভিযান’ কোনো সমাধান নয়। মিনিয়াপলিসের মেয়র জেকব ফ্রে একে ‘সন্ত্রাসী’ আচরণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, শহর প্রশাসন কোনোভাবেই আইসিই-এর সঙ্গে সহযোগিতা করবে না। তিনি আবেগভরে বলেন, “আমাদের সোমালি সম্প্রদায়কে আমরা ভালোবাসি, আমরা তাদের সঙ্গে আছি।”
সিটি কাউন্সিল সদস্য জামাল ওসমান বলেন, “এটি ভয়ঙ্কর একটি সময়। কিন্তু আমরা এখানে আছি, আমরা এই দেশকে ভালোবাসি। এটা আমাদের ঘর, আমরা কোথাও যাচ্ছি না।”
এর আগে নভেম্বরের শেষ দিকে ট্রাম্প সোমালি অভিবাসীদের অস্থায়ী সুরক্ষা মর্যাদা বা টিপিএস বাতিলের ঘোষণা দেন—যার সুবিধাভোগী প্রায় ৭০৫ জন। তিনি অভিযোগ করেন—প্রমাণ ছাড়া—সোমালি গ্যাং রাজ্যজুড়ে অপরাধ ছড়াচ্ছে এবং রাজ্যের সরকারি অর্থ পাচারে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই শত্রুতার শুরু সম্ভবত এক রক্ষণশীল লেখকের প্রতিবেদনের পর, যেখানে দাবি করা হয়েছিল—সোমালিরা কল্যাণ ভাতা নিয়ে দেশে টাকা পাঠাচ্ছে এবং তার একাংশ নাকি পৌঁছে যাচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠী আল-শাবাবের হাতে। যদিও প্রতিবেদনটির অনেক দাবি ছিল অপ্রমাণিত। আদালতও বলেছে, বিশাল অঙ্কের জালিয়াতির মামলার মূল হোতা ছিলেন এক শ্বেতাঙ্গ নারী, তবে কয়েকজন সোমালি-আমেরিকানও জড়িত ছিলেন।
কংগ্রেসওম্যান ইলহান ওমর এসব অভিযোগকে নিছক উস্কানি বলে অভিহিত করেছেন। তিনি বলেন, প্রমাণ থাকলে সামনে আনুন, কিন্তু কয়েকজনের কাজের জন্য গোটা সম্প্রদায়কে দোষারোপ করা যায় না। ট্রাম্পের মন্তব্য সম্পর্কে ওমরের প্রতিক্রিয়া—“তার এই অদ্ভুত আসক্তি সত্যিই ভৌতিক।”
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রায় ২ লক্ষ ৬০ হাজার সোমালি বংশোদ্ভূত নাগরিক রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে সবচেয়ে বড় সোমালি প্রবাসী জনসংখ্যার একটি অংশ রয়েছেন মিনেসোটায়—প্রায় ৬৩ হাজার মানুষ। গত কয়েক দশক ধরে তারা ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, রাজনীতি—সব ক্ষেত্রেই নিজেদের অবস্থান গড়ে তুলেছেন। তবু বৈষম্য ও ভুল ধারণার ছায়া তাদের পথ থেকে সরে যায়নি কখনও।
মিনেসোটার সোমালি সম্প্রদায় আজ যে অনিশ্চয়তার আঁধারে ঢেকে আছে, তার পরিধি কেবল রাজনৈতিক নয়—এটি মানবিকতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে। একদিকে সরকারের কঠোরতা, অন্যদিকে ঘৃণার ঢেউ—এর মাঝে দাঁড়িয়ে আছে একটি সম্প্রদায়, যারা এই দেশকে তাদের দ্বিতীয় জন্মভূমি বলে মনে করে। তবুও তাদের চারপাশে জমছে আতঙ্কের মেঘ, আর প্রশ্ন ভেসে বেড়াচ্ছে—এই দেশ কি সত্যিই সবার?
















