যুক্তরাজ্যে ক্রমেই বেশি বাবা–মা স্মার্টফোনের লোকেশন অ্যাপ ব্যবহার করে প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের অবস্থান জানতে চাইছেন। কেউ মনে করেন এটি যত্ন ও নিরাপত্তার অংশ, আবার অনেকেই বলছেন—এটি বাবা–মায়ের ‘ছাড়তে না পারা’ মানসিকতার প্রতিফলন।
স্টিভেন মেডওয়ে (৫৩), কার্ডিফের কাছে মাইকেলস্টন-ই-ফেডওর বাসিন্দা। তিনি পরিবারের সবাইকে Life360 অ্যাপে যুক্ত করে রেখেছেন। মেয়ের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে বাড়ি থেকে ১০০ মাইল দূরে চলে যাওয়ার পর এটি আরও কার্যকর বলে মনে করেছেন। তাঁর ভাষায়, “এতে ওকে এত দূরে মনে হয় না।”
Unite Students–এর এক জরিপে দেখা গেছে, যুক্তরাজ্যের প্রথম বর্ষের বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের ৬৭ শতাংশ বাবা–মা লোকেশন অ্যাপ ব্যবহার করেন, যদিও দৈনিক যোগাযোগ করেন মাত্র ১৭ শতাংশ।
মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কনটেন্ট নির্মাতা ও চিকিৎসক ড. মার্টিন ব্রুনেট বলছেন, এটা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত হলেও বাবা-মায়ের উচিত সন্তানকে “উড়ে যেতে দেওয়া”—কারণ অতিরিক্ত নজরদারি দীর্ঘমেয়াদে কারও জন্যই ভালো নয়।
স্টিভেনের মেয়ে মার্থা ১৯ বছর বয়সে জাপান ও ইউরোপে একা ভ্রমণ করেছেন, তাই তিনি তার স্বাধীনতা নিয়ে নিশ্চিন্ত। তিনি বলেন, “মার্থা চাইলে যেকোনো সময় অ্যাপ বন্ধ করতে পারে। আমি কখনো বাধ্য করিনি।”
অন্যদিকে সুয়ানসির মারিয়া কনোলি (৫৬) তার অটিস্টিক ছেলে ওয়াইনকে নজরে রাখতে অ্যাপটিকে প্রয়োজনীয় মনে করেন। তিনি বলেন, “ও শুরুতে চাইছিল না। কিন্তু আমি বললাম, আমি মোবাইল বিল দিই—তাই নিরাপত্তার জন্য অ্যাপটা লাগানোই ভালো।” তিনি মজা করে ছেলেকে ওয়েদারস্পুনসে দেখলে টেবিল নম্বর জেনে পানীয় পাঠিয়ে দেন, তবে স্বীকার করেন—এর পেছনে রয়েছে নিরাপত্তা ভাবনা।
অনেকে সাম্প্রতিক দুর্ঘটনার উদাহরণ টেনে নিরাপত্তার কথা বলেছেন, যেমন ২০২৩ সালের সেন্ট মেলনসের দুর্ঘটনা, যেখানে গাড়ি খুঁজে পেতে দুই দিন লেগেছিল।
এক জরিপ বলছে, মেয়েদের তুলনায় বাবারা বেশি ট্র্যাকিং অ্যাপ ব্যবহার করেন—বাবাদের ৭১ শতাংশ ও মায়েদের ৫৯ শতাংশ।
কার্ডিফের লিয়েন হ্যানাম (৪৫) তার মেয়ে এরিন মে (২১) ও ছেলে অস্টিন লি (১৫)–কে Life360–এ যুক্ত রেখেছেন। মেয়ের রাতের শিফটে কাজ শুরু করা ও নতুন ড্রাইভার হওয়ায় মা হিসেবে উদ্বেগ থেকেই এই সিদ্ধান্ত। তার মতে, “আমি সন্তানকে আটকাচ্ছি না, শুধু জানি সে কোথায়—এটা আমাকে শান্ত রাখে।”
তবে ড. ব্রুনেট সতর্ক করে বলেন, “যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে গেলে ট্র্যাক করেন, পাঁচ বছর পরও কি করবেন? কখন থামবেন?” তাঁর মতে, কোম্পানিগুলো ভালোবাসাকে ট্র্যাকিংয়ের সঙ্গে যুক্ত করে যে বার্তা দেয়, তাতে বাবা–মায়েরা স্বল্পমেয়াদি স্বস্তি পেলেও দীর্ঘমেয়াদে উদ্বেগ বাড়তে পারে।
তিনি বলেন, “যেমন কোনো গাছ যদি বাতাসহীন ঘরে বড় হয়, তা লম্বা হয় কিন্তু মজবুত হয় না। সন্তানকেও নিরাপদ পরিবেশে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে দেওয়া জরুরি।”
এ কারণে প্রশ্ন এখন আরও জোরালো—ট্র্যাকিং কি সত্যিই নিরাপত্তা? নাকি বাবা-মায়ের ছাড়তে না পারা এক ধরনের মানসিক আশ্রয়?















