ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর দুর্নীতি মামলায় পূর্ণ ক্ষমার আবেদনকে ঘিরে তেল আবিবে প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগের বাড়ির সামনে রোববার রাতে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
৭৬ বছর বয়সী নেতানিয়াহু দুর্নীতিবিষয়ক তিনটি মামলার বিচার চলমান অবস্থায় কোনও দোষ স্বীকার না করেই রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চান। এ খবর প্রকাশের পরই শত শত ইসরায়েলি রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ জানায়।
বিক্ষোভকারীরা ‘ক্ষমা = কলা প্রজাতন্ত্র’ স্লোগানে প্রেসিডেন্টের বাসভবনের সামনে সমাবেশ করেন। কেউ কেউ নেতানিয়াহুর মুখোশ পরে কারাগারের পোশাক পরে, আবার কেউ বড় একটি কলার স্তূপ সামনে রেখে ক্ষমার আবেদনের প্রতি বিদ্রূপ প্রকাশ করেন।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া বিরোধী দলীয় সাংসদ নাহামা লাজিমি বলেন, নেতানিয়াহুর এই সিদ্ধান্ত দেশের বিচারব্যবস্থাকে অবমাননা করছে এবং তিনি যাতে ক্ষমা না পান তা নিশ্চিত করতে জনগণ রাস্তায় নেমেছে।
প্রখ্যাত আন্দোলনকারী শিকমা ব্রেসলার বলেন, “তিনি বিচার প্রক্রিয়া থামিয়ে কোনোরকম দায়িত্ব না নিয়েই নিজেকে রক্ষা করতে চাইছেন। দেশজুড়ে বিভাজন বাড়ছে।”
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ঘুষ, প্রতারণা এবং আস্থাভঙ্গের অভিযোগে পাঁচ বছর ধরে তিনটি মামলা চলছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে একটিতে বলা হয়েছে, তিনি ও তার স্ত্রী সারা ধনী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সিগার, গয়না ও শ্যাম্পেনসহ ২ লাখ ৬০ হাজার ডলারের বিলাসসামগ্রী নিয়েছিলেন রাজনৈতিক সুবিধা দেওয়ার বিনিময়ে। আরও দুই মামলায় তাকে গণমাধ্যমে অনুকূল সংবাদ পেতে চুক্তির চেষ্টা করার অভিযোগ আনা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার আইনজীবীরা প্রেসিডেন্টকে পাঠানো ১১১ পৃষ্ঠার চিঠিতে দাবি করেন, বিচার চলতে থাকলে তিনি শেষ পর্যন্ত খালাস পাবেন। তবে নেতানিয়াহু ভিডিও বিবৃতিতে বলেন, দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে বিচার চলমান রাখা ‘জাতীয় স্বার্থের বিপরীত’।
প্রেসিডেন্ট হারজগের দপ্তর জানিয়েছে, তারা আবেদনটি পেয়েছে এবং বিষয়টি “অসাধারণ ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ” হওয়ায় সব পক্ষের মতামত নিয়ে সতর্কতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
দেশীয় মামলার পাশাপাশি নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত–আইসিসি ২০২৪ সালে গাজায় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে। ওই যুদ্ধে এখন পর্যন্ত ৭০ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে।
নেতানিয়াহুর ক্ষমার আবেদনের পিছনে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রকাশ্য সমর্থনের কথাও উঠে এসেছে। গত মাসে তিনি ইসরায়েলি সংসদে ভাষণে হারজগকে নেতানিয়াহুকে ক্ষমা দিতে অনুরোধ করেছিলেন।
এদিকে বিরোধী নেতা ইয়াইর লাপিদ বলেছেন, দোষ স্বীকার, অনুতাপ এবং অবিলম্বে পদত্যাগের আগেই কোনো ক্ষমা দেওয়া উচিত নয়। অন্য বিরোধী রাজনীতিক ইয়াইর গোলান বলেন, “কেবল অপরাধীরাই ক্ষমা চায়,” এবং নেতানিয়াহুর অবিলম্বে পদত্যাগ দাবি করেন।
ইসরায়েলের গণমান মান আন্দোলন সংগঠন জানায়, একজন প্রধানমন্ত্রীকে এমন গুরুতর অভিযোগে বিচারাধীন অবস্থায় ক্ষমা দেওয়া আইন শাসনের জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করবে।
প্রেসিডেন্টের বাড়ির সামনে বিক্ষোভে অংশ নেওয়া আমি ড্রর বলেন, “আইনশাসন ভেঙে পড়লে ইসরায়েলি গণতন্ত্রের সমাপ্তি ঘটবে।”
নেতানিয়াহুর মিত্ররা অবশ্য ক্ষমার আবেদনের পক্ষে বক্তব্য দিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা মন্ত্রী ইতামার বেন–গভির ও অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোটরিচ দাবি করেন, নেতানিয়াহু বছরের পর বছর “বিচার বিভাগের রাজনৈতিক নিপীড়নের” শিকার।
আল জাজিরার রাজনৈতিক বিশ্লেষক মারওয়ান বিশারা বলেন, নেতানিয়াহু বর্তমানে ইসরায়েলের জন্য “বোঝা” হয়ে উঠেছেন এবং তার নেতৃত্বে না অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াবে, না সমাজ শান্ত হবে।
তার মতে, নেতানিয়াহু বিচারব্যবস্থাকে দুর্বল করতে কাজ করে এসেছেন এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যুদ্ধাপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হওয়ায় তিনি এখন “এক আন্তর্জাতিক পলাতক”।
















