বিশ্বের তৃতীয় দামী মসলা হিসেবে পরিচিত এলাচ বা এলাচ চাষ যত লাভজনকই হোক, বাস্তবে এটি সবচেয়ে জটিল ও সংবেদনশীল ফসল—এমন মন্তব্যই করছেন ভারতের কেরালার অভিজ্ঞ চাষি স্ট্যানলি পথম। প্রতিদিন গাছের প্রতিটি পাতা ও ফুল পর্যবেক্ষণ করতে হয় বলে তিনি জানান, সামান্য আবহাওয়ার পরিবর্তন বা রোগবালাই পুরো মৌসুমের উৎপাদন নষ্ট করে দিতে পারে। গত বছরের প্রচণ্ড গরমে কেরালার পাশাপাশি বিশ্বের সবচেয়ে বড় উৎপাদক গুয়াতেমালাও বড় ক্ষতির মুখে পড়ে।
দুর্যোগপূর্ণ মৌসুম এলাচের দামও বাড়িয়েছে। ভারতের স্পাইস বোর্ডের হিসাবে, গত বছর এলাচের কেজিপ্রতি দাম ৭০ শতাংশ বেড়ে ১,১৭৮ রুপিতে পৌঁছায়। ব্যয়বহুল হলেও উৎপাদন বাড়ানো কঠিন, কারণ “একটা খারাপ গ্রীষ্মেই সব শেষ”, বলেন পথম।
এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সরকারি উদ্যোগে ইন্ডিয়ান কার্ডামম রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ICRI) কাজ করছে। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ড. এ বি রীমা বলেন, ফসল উন্নয়ন, রোগ-নিয়ন্ত্রণ, মাটির বিশ্লেষণ থেকে শুরু করে প্রযুক্তি-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ পর্যন্ত সব দিকেই কাজ হচ্ছে। সংস্থার একটি অ্যাপ এখন চাষিদের মাটির স্বাস্থ্য যাচাই ও প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছে।
একই সঙ্গে বিজ্ঞানীরা রোগ প্রতিরোধী, বেশি ফলনশীল এবং জলবায়ু-সহনশীল জাত উদ্ভাবনের চেষ্টা করছেন। কেরালা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর প্রীতি চেট্টি জানান, কম পানি সহ্য করতে পারে এমন একটি জাত ইতোমধ্যে পাওয়া গেছে। এলাচের জিনগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণাও চলছে, যা ভবিষ্যতে আরও উন্নত জাত উদ্ভাবনে সহায়তা করবে।
চাষ শেষে এলাচ শুকানোর প্রক্রিয়াটিও অনেক গুরুত্বপূর্ণ। আগে বড় বাগানগুলোই নিজেদের ড্রায়ার স্থাপন করতে পারত। ছোট চাষিরা অন্যের ওপর নির্ভর করায় মান ক্ষুণ্ন হতো। এটি মাথায় রেখে সামাজিক উদ্যোগ গ্রাম্যা ২০১৬ সাল থেকে হিট-পাম্প ড্রায়ার চালু করেছে। উদ্যোক্তা অন্নু সানি জানান, কাঠ-চালিত ড্রায়ারের তুলনায় কম খরচে এবং ধোঁয়াবিহীন শুকানোর ফলে এলাচের প্রাকৃতিক সবুজ রং বজায় থাকে।
এদিকে কিছু কৃষক জৈব পদ্ধতিতে এলাচ চাষের চেষ্টায় নেমেছেন। ব্যাংকার থেকে কৃষকে রূপান্তরিত ম্যাথিউজ জর্জ জানান, শুরুর দিকে তার ৯০ শতাংশ ফসল নষ্ট হয়। পরে প্রাচীন ভারতীয় কৃষিপদ্ধতি বৃক্ষায়ুর্বেদের প্রয়োগে কিছুটা সাফল্য মিলেছে। তবে এখনো চাষকে ‘নিত্য নতুন পরীক্ষা’ হিসেবেই দেখছেন তিনি।
জর্জের মতে, জৈব পদ্ধতি শুরুতে কঠিন হলেও সঠিকভাবে প্রয়োগ করতে পারলে খরচ কমে লাভ বাড়তে পারে। কিন্তু এলাচ চাষে অভিজ্ঞ শ্রমিকের প্রয়োজনীয়তা এখনো অপরিবর্তনীয়। স্ট্যানলি পথম বলেন, শ্রম ব্যয়ই সবচেয়ে বড় অংশ; এর বেশিরভাগ ব্যয় ফসল তুলতে হয়। নারীরাই সাধারণত এ কাজে দক্ষ—কারণ একটি গুচ্ছ থেকে কোন দানা তুলতে হবে, সেটা তাদের অভিজ্ঞ চোখেই বোঝা যায়।
গ্রাম্যা প্রতিষ্ঠাতা অন্নু সানি মনে করেন, এলাচ চাষে যান্ত্রিকীকরণের সীমা খুবই কম। স্প্রে বা আগাছা পরিষ্কার করা যন্ত্রের মাধ্যমে হলেও ছাঁটাই ও সংগ্রহ পুরোপুরি হাতে করতে হয়।
স্ট্যানলি পথমের মতে, “এলাচ শুধু প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই হয় না—এতে বিজ্ঞান যেমন লাগে, তেমনই দরকার গভীর মনোযোগ আর অভিজ্ঞতার ‘আত্মা।’
















