ঘানার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের গামবাগা এলাকায় কাদামাটির ঘর-বেষ্টিত ছোট্ট এক বসতি—স্থানীয়দের কাছে যা পরিচিত ‘ডাইনি শিবির’ নামে। এখানে বাস করেন বয়সে প্রবীণ, আশ্রয়হীন এবং পরিবার বা সমাজের কাছে ‘ডাইনি’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে নির্বাসিত হওয়া শতাধিক নারী। তাঁদেরই একজন ৮৫ বছর বয়সী বাচালিবানোয়া আনাবেরি, যিনি প্রায় ৪৫ বছর ধরে এখানে থাকছেন। স্বামীর মৃত্যুর পর স্বামীর অন্য স্ত্রীর সন্তানরা তাঁকে নানা অমঙ্গল ঘটনার জন্য দায়ী করে ডাইনি আখ্যায়িত করলে তিনি এই শিবিরে আশ্রয় নেন।
দেশজুড়ে জাদুবিদ্যা ও অতিপ্রাকৃত শক্তির প্রতি বিশ্বাস প্রবল থাকায় নারী, বিশেষ করে বৃদ্ধা ও বিধবারা প্রায়ই অভিযোগের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হন। গবেষক জন আজুমাহ জানান, হিংসা, জমি-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ বা ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণেও নারীদের বিরুদ্ধে ডাইনির অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ প্রমাণের জন্য স্থানীয়রা কখনও কখনও প্রাণী উৎসর্গের মতো ঐতিহ্যগত রীতি পালন করে, যদিও এসবের পরও অধিকাংশ নারী আর বাড়ি ফিরতে পারেন না।
উত্তরের বিভিন্ন এলাকায় ডাইনি শিবিরগুলো ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে। কুকুও, গ্নানি ও কপাতিংগার মতো এলাকাগুলোর এসব শিবিরে নারীরা সমাজচ্যুত হওয়ার পর আশ্রয় পান। তবে শারীরিক নিরাপত্তা থাকলেও তাঁরা মানসিকভাবে বন্দী হয়ে পড়েন। শিবির থেকে বের হলে বিপদ ঘটবে—এমন ধারণা তাঁদের মনে গভীরভাবে প্রোথিত হয়ে গেছে।
কপাতিংগা শিবিরে প্রায় ৪০ জন নারী থাকেন। তাঁদের অনেকেই ঘরে ফেরার পথ হারিয়েছেন। ৬৮ বছর বয়সী আবদুলিয়া মেইলি জানান, ছেলের অভিযোগের পর তিনি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছিলেন। এখন ছেলের অনুশোচনা থাকলেও গ্রাম তাঁকে আর গ্রহণ করতে চায় না।
গ্নানি শিবিরে বাস করা ফুশেইনা ডাকুরুগুর মতো অনেক নারী নিজের সন্তানদের সঙ্গেও বিচ্ছিন্নতায় ভুগছেন। শিবিরে খাবার, চিকিৎসা ও জীবিকার অভাবও বড় সমস্যা। বিভিন্ন এনজিও ও ধর্মীয় সংগঠন তাঁদের সহায়তা করার চেষ্টা করলেও দুর্দশা পুরোপুরি কাটে না। শিবিরে বসবাসরত শিশুদের প্রতিও একই ধরনের সামাজিক অবজ্ঞা তৈরি হয়।
গামবাগার শিবিরটি তুলনামূলকভাবে মানবিক পরিবেশে পরিচালিত হয়, যেখানে স্থানীয় গির্জা ও সমাজকর্মীরা নারীদের মানসিক সহায়তা ও পুনর্বাসনে কাজ করেন। কিছু নারী নিজ পরিবারে ফিরে যেতে পেরেছেন। তবে এসব ঘটনা বিরল।
ঘানার সংসদে ‘অ্যান্টি-উইচক্রাফ্ট বিল’ পুনরায় উত্থাপিত হয়েছে, যা পাস হলে ডাইনি অভিযোগকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে এবং আক্রান্তদের পুনর্বাসনের উদ্যোগ বাড়বে। তবুও সামাজিক কুসংস্কার ও গভীরভাবে গেঁথে থাকা বিশ্বাসের পরিবর্তন সহজ নয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
গামবাগার ৮৫ বছর বয়সী আনাবেরির মতো অনেক নারীই হয়তো জীবদ্দশায় নিজেদের পরিবার বা সমাজে আর ফিরে যেতে পারবেন না। দীর্ঘ নির্জন নির্বাসনের মধ্যেই তাঁদের জীবন কেটে যাচ্ছে, পরিবর্তনের আশায়।
















