ইসলামাবাদের আকাশে আজ এক অদৃশ্য চাপ ভেসে বেড়ায়। মৈত্রীর টান, রাজনীতির হিসাব, অর্থনীতির বোঝা আর মানুষের আবেগ—সব মিলিয়ে পাকিস্তানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক কঠিন প্রশ্ন: গাজায় সম্ভাব্য সেনা মোতায়েন কি তাদের পক্ষে সম্ভব, নাকি তা ঘরে-বাইরে নতুন ঝড় ডেকে আনবে?
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাবিত যে খসড়া পাস হলো, যা গাজায় একটি অন্তর্বর্তী প্রশাসন এবং আন্তর্জাতিক স্থিতিশীলতা বাহিনী গঠনের পথ খুলে দিয়েছে, তার প্রতি পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্বিমুখী। প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দিলেও পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমেদ জানিয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ কিছু পরামর্শ উপেক্ষিত হয়েছে।
তার কণ্ঠে ছিল সতর্কতা, যেন এক অস্থির ভবিষ্যতের আঁচ। তিনি বলেন, এখনো অস্পষ্ট অনেক বিষয়—জাতিসংঘের ভূমিকা কী হবে, বোর্স অব পিস নামে প্রস্তাবিত কাঠামোর অবস্থান কী, আর স্থিতিশীলতা বাহিনীর ক্ষমতা কোন সীমায় থাকবে।
তবুও—পাকিস্তান আগেই ডোনাল্ড ট্রাম্পের কুড়ি দফা গাজা যুদ্ধবিরতি পরিকল্পনায় সম্মতি দিয়েছে। আর মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় সেনাবাহিনী হওয়ায় সবাই ধরে নিচ্ছে, স্থিতিশীলতা বাহিনীতে পাকিস্তান বড় ভূমিকা রাখবে।
বাড়ছে কূটনৈতিক ব্যস্ততা
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে পাকিস্তান যেন মধ্যপ্রাচ্যের অঙ্গনে আবারও গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত হয়েছে। জর্ডানের রাজা আবদুল্লাহ দ্বিতীয়ের সফর, সেনাপ্রধান ও প্রধানমন্ত্রী উভয়ের কায়রো ও ওয়াশিংটন সফর, আর সৌদি আরবের সঙ্গে পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি—সব কিছুই পাকিস্তানের বাড়তি ভূরাজনৈতিক ও সামরিক গুরুত্বের ইঙ্গিত বহন করে।
পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনের স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবিতে অনড়। কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র ও আরব মিত্রদের অনুরোধে তারা জটিল এক সিদ্ধান্তের সামনে দাঁড়িয়ে—গাজা মিশনে যোগ দেবেন কি দেবেন না?
দেশে রাজনৈতিক ঝুঁকি, মনে জমা ক্ষোভ
পাকিস্তানের সাধারণ মানুষদের হৃদয়ে ফিলিস্তিনের প্রশ্ন বহু পুরোনো, আবেগপূর্ণ। দেশটি ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেয় না, এমনকি পাসপোর্টেও স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা লেখা।
এ অবস্থায় ইসরায়েলকে কেন্দ্র করে তৈরি যেকোনো সামরিক যৌথ মিশনে অংশগ্রহণ মানে রাজনৈতিক বিস্ফোরণ ডেকে আনা।
প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ যদিও বলেছেন—এতে অংশ নিতে পারলে তা হবে সম্মানের বিষয়—তবুও সরকার এখনো পরিষ্কার সিদ্ধান্ত জানায়নি।
পরিষ্কার কাঠামো ছাড়া অগ্রগতি কঠিন
জাতিসংঘের প্রস্তাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের আপত্তি একটাই—অস্পষ্টতা। গাজার শাসন কাঠামো, শান্তিবাহিনীর ভূমিকা, নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা—সব যেন ধোঁয়াশায় ঢাকা।
চীনসহ কয়েকটি দেশ তাই ভোটে বিরত থেকেছে।
হামাসও বলেছে—এই প্রস্তাব ফিলিস্তিনের অধিকারকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে না; বরং গাজাকে আন্তর্জাতিক তত্ত্বাবধানে ঠেলে দিচ্ছে।
পাকিস্তানের জন্য লাভ–ক্ষতির শাস্ত্র
অর্থনৈতিক সংকটের মাঝে যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় মিত্রদের সমর্থন পাকিস্তানের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বিশ্লেষকদের মতে, সামরিকভাবে সহযোগিতা করলে ইসলামাবাদ কূটনৈতিকভাবে লাভবান হতে পারে।
পাকিস্তান শান্তিরক্ষায় অভিজ্ঞ; বহু বছর ধরেই জাতিসংঘ মিশনে তাদের উপস্থিতি প্রশংসিত। অবসরপ্রাপ্ত জেনারেলরা বলছেন—যে কোনো সিদ্ধান্ত অবশ্যই জনসমক্ষে আলোচনা করতে হবে, কারণ জনগণের আস্থা ছাড়া এই ধরনের সংবেদনশীল মিশন অসম্ভব।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন: ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় কি সম্ভব?
এটাই আসলে পাকিস্তানের ভিতরের বিতর্কের কেন্দ্রে।
ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো ধরনের যৌথ কার্যক্রম—even পরোক্ষ হলেও—পাকিস্তানের অভ্যন্তরে তুমুল প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করবে।
অনেকে বলছেন—অন্যান্য দেশ নেতৃত্ব নিলে পাকিস্তান সরাসরি ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বয় এড়াতে পারে।
কিন্তু আরেক অংশ মনে করে—এমন সমন্বয়ের সামান্য ইঙ্গিতও সরকারের জন্য বিপজ্জনক হবে।
গাজার ধ্বংসাবশেষের মধ্যে আজ মানবতার আর্তি সবচেয়ে প্রবল। পাকিস্তান কি সে আহ্বানে সাড়া দেবে?
নাকি ঘরের আগুনেই পুড়ে যাবে তাদের নীতি নির্ধারণের পথ?
রাষ্ট্রনীতি কখনো সহজ হয় না—বিশেষ করে যখন মানবতার কান্না, রাজনীতির হিসাব আর জনগণের আবেগ একই ঘূর্ণাবর্তে ঘুরতে থাকে।
















