র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) বিতর্কিত ও গোপন ‘গলফ অপারেশন’ সংক্রান্ত সংবেদনশীল তথ্য বাইরে প্রকাশ করে দেওয়ার অভিযোগে ট্রলারচালক আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ বা হত্যা করার নির্দেশ প্রদান করেছিলেন বাহিনীর তৎকালীন গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান জিয়াউল আহসান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ উপস্থিত হয়ে তৎকালীন সেনা কর্মকর্তা ও সাবেক মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী নিজের দেওয়া জবানবন্দিতে এই বিস্ফোরক দাবি করেছেন।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক বেঞ্চের সামনে উপস্থিত হয়ে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধ সংক্রান্ত মামলার অংশ হিসেবে এই সাক্ষ্যপ্রমাণ পেশ করেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর সাব্বির।
আদালতে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিতে গিয়ে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, আনুমানিক ২০১১ সালের জুন মাসের দিকে একদিন হঠাৎ করেই তৎকালীন র্যাব কর্মকর্তা জিয়াউল আহসান তাকে মোবাইল ফোনে কল দেন। ফোনালাপে জিয়াউল আহসান তার কাছে ‘গলফ কাজে’ যুক্ত অন্যতম ট্রলারচালক আলকাছ মাঝির বিষয়ে খোঁজখবর নিতে চান। তখন সাব্বির তাকে জানান যে, আলকাছের ব্যাপারে তাঁর বিশেষ কিছু জানা নেই; কারণ র্যাব-৮-এর সাথে সংযুক্ত গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা ওই মাঝিকে নিয়ন্ত্রণ করা, পরিচালনা করা এবং পারিশ্রমিক বা ভাতা দেওয়ার বিষয়টি দেখভাল করতেন।
জবাবে জিয়াউল আহসান তাকে অবহিত করেন যে, আলকাছ মাঝি র্যাবের ‘গলফ অপারেশন’ সংক্রান্ত অত্যন্ত গোপনীয় তথ্যগুলো চরেদুয়ানী বাজারে সাধারণ মানুষের কাছে বলে বেড়াচ্ছে, যা বাহিনীর নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই কারণ দেখিয়ে তিনি সাব্বিরকে সরাসরি আলকাছ মাঝিকে ‘এলিমিনেট’ করার হুকুম দেন।
এই অনৈতিক ও মারাত্মক নির্দেশ শোনার পরপরই নিজের শারীরিক অসুস্থতার বাহানা তুলে উক্ত দায়িত্ব পালন থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য জিয়াউলের কাছে আকুতি-মিনতি শুরু করেন সাব্বির। পরিস্থিতির এই পর্যায়ে জিয়াউল আহসান ক্ষান্ত হয়ে বলেন, “থাক, আর লাগবে না।” ফোনালাপ শেষ হওয়া মাত্রই পুরো বিষয়টি তিনি নিজের ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক বা সিও-কে অবহিত করেন।
র্যাবের আলোচিত ‘গলফ অপারেশন’-এ আলকাছ মাঝির প্রত্যক্ষ ভূমিকা নিয়ে সাব্বির আদালতকে জানান, জিয়াউল আহসানের পরিচালনায় পরিচালিত সেই অভিযানে যেসকল মাঝিকে ট্রলার চালানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হতো, তাদের মধ্যে আলকাছ ছিলেন অন্যতম। তিনি নিজে বাধ্য হয়ে যতবার জিয়াউলের সাথে এই ধরনের অভিযানে অংশ নিয়েছেন, তার অধিকাংশ সময়েই আলকাছকে ট্রলারের চালক হিসেবে দেখেছেন।
এসব গোপন অভিযানে মানুষদের ট্রলারে করে জলপথে তুলে নিয়ে যাওয়া এবং পরবর্তী সময়ে নির্মমভাবে হত্যা করে পানিতে ভাসিয়ে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর চিত্র জবানবন্দিতে তুলে ধরেন তিনি। ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসের এক রাতের ঘটনা স্মরণ করে তিনি বলেন, সেদিন তাদের বহনকারী গাড়িটি প্রায় আড়াই ঘণ্টা চলার পর বরগুনার পাথরঘাটায় অবস্থিত চরদুয়ানী ঘাটে পৌঁছায়। সেখানে আগে থেকেই র্যাব-৮-এ কর্মরত গোয়েন্দা শাখার সদস্যরা একটি ট্রলার প্রস্তুত করে রেখেছিল। এরপর হাত বাঁধা ও মাথায় কালো টুপি পরানো অবস্থায় এক ব্যক্তিকে ট্রলারে তোলা হয় এবং ট্রলারটি মোহনার দিকে গিয়ে পানির গভীরতা মাপতে শুরু করে।
গভীর পানি নিশ্চিত হওয়ার পর জিয়াউল আহসানের প্রত্যক্ষ আদেশে ওই ব্যক্তির গলা ও পায়ে সিমেন্ট ভর্তি ভারি বস্তা বাঁধা হয়। এরপর মাথায় ও কান বরাবর একটি ছোট বালিশ চেপে ধরে শব্দ কম করার উদ্দেশ্যে তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। মৃত্যুর পর পেট কেটে সিমেন্টের বস্তাসহ মরদেহটি পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে ফেরার পথে জিয়াউল আহসান মন্তব্য করেছিলেন, এরা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতিকর এবং এদের এভাবে সরিয়ে দেওয়াই শ্রেয়; এই প্রক্রিয়াকেই তারা ‘গলফ করা’ হিসেবে অভিহিত করতেন। সাব্বির তখনই প্রথম জানতে পারেন যে এই ধরনের অভিযানগুলো ‘গলফ অপারেশন’ নামে পরিচিত। একইভাবে ২০১০ সালের মে মাসেও চারজনকে একই কায়দায় হাত বেঁধে, মাথায় টুপি পরিয়ে ট্রলারে তুলে একই প্রক্রিয়ায় হত্যা করে লাশ গুম করা হয়েছিল। আর এসব অভিযানের সময় ট্রলার চালকের দায়িত্বে ছিলেন এই আলকাছ মাঝি।
আলকাছ মাঝির নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে সাবেক এই মেজর জানান, তাকে হত্যার নির্দেশ দেওয়ার প্রায় এক সপ্তাহ পরেই অধিনায়কের কক্ষে তাকে ডেকে নেওয়া হয়। সেখানে বসা ব্যক্তিদের আলকাছের স্বজন হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন অধিনায়ক।
আলকাছের স্ত্রী জানান, ৪-৫ দিন পূর্বে জিয়া স্যারের কথা বলে আলকাছকে ফোনে ডেকে নেওয়া হয়েছিল। বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় আলকাছ তাঁর স্ত্রীকে জানান যে জিয়া স্যার তাকে ডেকেছেন। এরপর থেকে আর তার কোনো খোঁজ মিলছিল না।
ঘটনা শুনে আলকাছের পরিণতি সম্পর্কে বুঝতে অধিনায়কের বা সাব্বিরের কোনো বাকি থাকেনি। তৎকালীন অধিনায়ক আলকাছের স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে জানান যে তাকে খুঁজে বের করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হবে এবং যেহেতু সে গোয়েন্দা শাখার সাথে কাজ করতো, তাই র্যাব সদরদপ্তরেও বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে জানানোর পরামর্শ দেওয়া হয়। অবশেষে নিখোঁজ আলকাছের পরিবারকে কিছুটা আর্থিক সাহায্য প্রদান করে সেখান থেকে বিদায় জানানো হয়েছিল।


























