শীতের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ইউক্রেন যুদ্ধ যেন আবারও প্রজ্বলিত আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ছে পূর্ব ইউরোপের আকাশে। ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী জানিয়েছে, তারা রুশ রাজধানী মস্কোর নিকটবর্তী রিয়াজান অঞ্চলের একটি তেল শোধনাগারে হামলা চালিয়েছে। মাত্র এক দিন আগেই রুশ বাহিনীর বিধ্বংসী আক্রমণে কিয়েভে অন্তত ছয়জন নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার পর পাল্টা জবাব হিসেবে এ হামলা চালানো হয়।
ইউক্রেনীয় সেনাবাহিনী সামাজিক মাধ্যমে জানায়, এই হামলার লক্ষ্য ছিল শত্রুপক্ষের ক্ষেপণাস্ত্র ও বোমা বর্ষণের সক্ষমতা দুর্বল করে দেওয়া। তাদের ভাষায়, এটি সেই প্রচেষ্টার অংশ, যার মাধ্যমে যুদ্ধের আকাশে ছড়িয়ে থাকা রুশ অস্ত্রবৃষ্টিকে কিছুটা হলেও থামানোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে।
শুক্রবারের ভয়ংকর আক্রমণে কিয়েভের অসংখ্য ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রাষ্ট্রপতি ভলোদিমির জেলেনস্কি একে বর্ণনা করেছেন অমানবিক হামলা হিসেবে। তিনি জানান, প্রায় চার শতাধিক ড্রোন আর আঠারোটি মারাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে রুশ বাহিনী, যার মধ্যে ব্যালিস্টিক ও অ্যারোব্যালিস্টিক মিসাইলও ছিল।
প্রতিশোধের আগুনে ইউক্রেনও শত্রুর শক্তির কেন্দ্রবিন্দুতে পাল্টা আঘাত হেনেছে। দুই দেশের মধ্যে জ্বালানি স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা-পাল্টা হামলা এখন এক নীরব যুদ্ধে পরিণত হয়েছে, বিশেষ করে আরেকটি নির্মম শীতের আগে যখন উভয় পক্ষই নিজেদের পক্ষে শক্তি ফিরিয়ে আনতে মরিয়া।
গত সপ্তাহে ইউক্রেনের রাষ্ট্রায়ত্ত বিদ্যুৎ সংস্থা ইউকরেেনারগো জানিয়েছে, রুশ হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনা মেরামতের কারণে দেশজুড়ে বিভিন্ন অঞ্চলে বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটবে।
অন্যদিকে রিয়াজান অঞ্চলের গভর্নর পাভেল মালকভ জানান, তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী রাতে পঁচিশটি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করেছে। পড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষে একটি কারখানায় আগুন লাগলেও হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। রুশ বার্তা সংস্থা রিয়া সংবাদ দিয়েছে, জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিস্থিতি এখন স্থিতিশীল, যদিও একটি বহিরাগত বৈদ্যুতিক লাইন নিরাপত্তাজনিত কারণে বন্ধ হয়ে গেছে।
এদিকে দক্ষিণের জাপোরিঝঝিয়া অঞ্চলে তীব্র লড়াইয়ের পর ইউক্রেনীয় বাহিনী পাঁচটি গ্রাম থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়েছে। সামনের সারির এই যুদ্ধে ক্লান্ত কিন্তু দৃঢ় ইউক্রেনীয় সেনারা রাষ্ট্রপতিকে জানিয়েছে তাদের অবর্ণনীয় সংগ্রামের কথা। জেলেনস্কি জানিয়েছেন, তিনি নিজে ফ্রন্টলাইন ঘুরে দেখেছেন এবং সেনাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তার কণ্ঠে আস্থা আর বেদনার মিশ্র সুর—রুশ বাহিনী ইউক্রেনের জীবনযাত্রা দুর্বিষহ করে তুলতে সর্বশক্তি নিয়ে নামলেও, ইউক্রেন তার জনগণকে রক্ষায় সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে।
যুদ্ধের এই দীর্ঘশ্বাসময় শীতের প্রান্তে দাঁড়িয়ে ইউক্রেন ও রাশিয়ার সংঘাত যেন আবারও নতুন অন্ধকারের দিকে পা বাড়াচ্ছে, আর সাধারণ মানুষের জীবন রয়ে গেছে আগুনের উপত্যকায় অসমাপ্ত প্রতীক্ষার মতো।
















