ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির দপ্তর দেশের গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও সামরিক পদে একাধিক পরিবর্তন এনেছে। এর অংশ হিসেবে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর সাবেক প্রধান মোহসেন রেজায়িকে সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব এবং সর্বোচ্চ নেতার প্রতিনিধি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতিতে দেশের নিরাপত্তা কাঠামো আরও সুসংহত করার লক্ষ্যেই এ পরিবর্তন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মোহসেন রেজায়ি দীর্ঘ সময় ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়েছেন এবং ইরাকের সঙ্গে যুদ্ধের সময়ও গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্বে ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি রাজনীতি ও অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণের সঙ্গে যুক্ত হন। চলমান সংঘাত শুরুর পর তিনি আবার সামরিক পোশাকে প্রকাশ্যে আসেন এবং সর্বোচ্চ নেতার সামরিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
নতুন সিদ্ধান্তের আওতায় ইরানের যৌথ যুদ্ধ কমান্ডের প্রধান আলী আবদোল্লাহিকে সশস্ত্র বাহিনীর নতুন প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আলী ওজমাইকে ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর নৌ শাখার প্রধান করা হয়েছে। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমাদ ওয়াহিদিকেও বাহিনীর প্রধান হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে। তিনি নিহত মোহাম্মদ পাকপুরের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব নিয়োগের মাধ্যমে ইরানের নেতৃত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় নমনীয় হওয়ার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও প্রতিরোধের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার বার্তা দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক সমঝোতা নিয়ে রেজায়ির আপত্তি থাকলেও তিনি সর্বোচ্চ নেতার সিদ্ধান্তকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেননি।
জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদে ইরানের প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, সশস্ত্র বাহিনী এবং নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধিরা যুক্ত থাকেন। গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সিদ্ধান্তে সর্বোচ্চ নেতার অনুমোদনও প্রয়োজন হয়। ফলে রেজায়ির নিয়োগকে সামরিক, কূটনৈতিক, অর্থনৈতিক ও জ্বালানি নীতির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা পরিষদ-সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের এক সম্পাদকীয়তে রেজায়ির নিয়োগকে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ বৃহত্তর কৌশলগত পুনর্গঠনের সূচনা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিচ্ছিন্নভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবর্তে সামরিক ও কূটনৈতিক নীতির মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো প্রয়োজন।
তবে রেজায়ির নিয়োগ ঘিরে ইরানের অভ্যন্তরে ভিন্ন প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে। কিছু কট্টরপন্থি নেতা ও সমর্থক এই পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের কেউ কেউ প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের সমঝোতাপন্থি নীতির সমালোচনায় এটিকে ব্যবহার করছেন।
অন্যদিকে ইসরায়েল রেজায়ির নিয়োগের কঠোর সমালোচনা করেছে। ১৯৯৪ সালে আর্জেন্টিনার রাজধানীতে একটি ইহুদি সম্প্রদায়ভিত্তিক কেন্দ্রে বোমা হামলার অভিযোগে রেজায়ি ও আহমাদ ওয়াহিদির বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক গ্রেপ্তারি নোটিশ রয়েছে বলে ইসরায়েল দাবি করেছে। ইরান অবশ্য এ অভিযোগের বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান নিয়ে আসছে।
রেজায়ির নিয়োগের পর ইরানের রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমে ইরাক যুদ্ধের সময়কার তার সামরিক ভূমিকা তুলে ধরা হয়েছে। এতে তাকে শক্তিশালী সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একই সময়ে ইরানের নিরাপত্তা কাঠামোয় নতুন নেতৃত্বের মাধ্যমে যুদ্ধকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও সামরিক-কূটনৈতিক সমন্বয় আরও জোরদার করার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য শুধু একজন নিরাপত্তা কর্মকর্তাকে সরিয়ে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়া নয়; বরং যুদ্ধ, কূটনীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তাকে একই কাঠামোর মধ্যে এনে ইরানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়া আরও কেন্দ্রীভূত করা। চলমান সংঘাতের মধ্যে এই পুনর্গঠন দেশটির ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক অবস্থানে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে।
















