লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলে আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের অর্থের অন্যতম প্রধান উৎস হয়ে উঠছে চীনা অর্থপাচার চক্র। অনানুষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তর, বাণিজ্য, ভূসম্পত্তি ও ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে এসব চক্র বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ স্থানান্তর ও বৈধ করার কাজে জড়িত বলে বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ অপরাধবিষয়ক গোয়েন্দা সংস্থার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত চীনা অর্থপাচার চক্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রায় ১ লাখ ৩৭ হাজার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে। এসব লেনদেনের মোট মূল্য প্রায় ৩১২ বিলিয়ন ডলার। এর সঙ্গে মাদক কারবারি চক্রসহ বিভিন্ন আন্তঃদেশীয় অপরাধী সংগঠনের যোগাযোগ থাকার তথ্যও রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব নেটওয়ার্ক এখন শুধু কোনো নির্দিষ্ট অপরাধী গোষ্ঠীর অর্থ পাচার করে না। প্রতারণা, মানবপাচার, অবৈধ খনন, মাদক উৎপাদন ও কর ফাঁকিসহ বিভিন্ন অপরাধ থেকে আসা অর্থের জন্য তারা এক ধরনের আর্থিক সেবা কাঠামো হিসেবে কাজ করছে।
অপ্রাতিষ্ঠানিক অর্থ স্থানান্তরের বিস্তার
চীনা অর্থপাচার ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হলো তথাকথিত ‘উড়ন্ত অর্থ’ পদ্ধতি। এর মাধ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে বিশ্বস্ত ব্যক্তিগত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে এক দেশ থেকে অন্য দেশে বিপুল অর্থের সমপরিমাণ মূল্য স্থানান্তর করা হয়।
অপরাধবিষয়ক গবেষকদের মতে, এই পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা হলো এর গতি ও কম খরচ। প্রচলিত অবৈধ মধ্যস্থতাকারীরা যেখানে প্রায় ২০ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ নেয়, সেখানে এসব নেটওয়ার্ক ৫ শতাংশের কম খরচে অর্থ স্থানান্তরের সুযোগ দেয়।
মাদক ও সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রগুলোর দ্রুত অর্থ স্থানান্তরের প্রয়োজন এবং চীনা নাগরিকদের বিদেশে অর্থ পাঠানোর সীমাবদ্ধতা—এই দুই প্রবণতার মিলনেই ব্যবস্থাটি আরও বিস্তৃত হয়েছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাণিজ্য, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন, আমদানি ও ভূসম্পত্তির ব্যবসার সঙ্গেও এসব অর্থপাচার চক্র যুক্ত হচ্ছে। ফলে অবৈধ অর্থের উৎস শনাক্ত করা ক্রমেই কঠিন হয়ে পড়ছে।
ডিজিটাল মুদ্রায় বাড়ছে ঝুঁকি
ডিজিটাল মুদ্রার বিস্তার অর্থপাচার চক্রগুলোর সক্ষমতা আরও বাড়িয়েছে। এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২০ সালে অবৈধ ডিজিটাল মুদ্রা-সংশ্লিষ্ট অর্থপাচারের পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার, যা ২০২৫ সালে বেড়ে ৮২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
এর মধ্যে চীনা ভাষাভাষী অর্থপাচার নেটওয়ার্কগুলো ২০২৫ সালে প্রায় ১৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অবৈধ সম্পদ লেনদেন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এটি শনাক্ত হওয়া বৈশ্বিক ডিজিটাল মুদ্রা অর্থপাচারের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ।
লাতিন আমেরিকাতেও ডিজিটাল মুদ্রার ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে এ অঞ্চলে ডিজিটাল মুদ্রার মোট লেনদেনের পরিমাণ প্রায় ১ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। এর একটি অংশ অবৈধ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
অপরাধী চক্রগুলো সরাসরি ডিজিটাল মুদ্রা লেনদেনের পাশাপাশি অনানুষ্ঠানিক দালাল নেটওয়ার্ক, অনলাইন জুয়া, অর্থবহনকারী ব্যক্তি এবং গোপন যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করছে। এতে অর্থের গতিপথ অনুসরণ করা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
কলম্বিয়া, ব্রাজিল ও চিলিতে বিস্তার
সাম্প্রতিক কয়েকটি তদন্তে অঞ্চলটির বিভিন্ন দেশে এসব নেটওয়ার্কের বিস্তারের চিত্র পাওয়া গেছে।
কলম্বিয়ায় মে মাসের শেষ দিকে হাইবো ঝাং নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তিনি একটি আন্তঃদেশীয় অর্থপাচার চক্রের নেতৃত্ব দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তদন্তকারীদের দাবি, বোগোতা ও ভায়া দেল কাওকার মধ্যে সক্রিয় ওই চক্র চীন, মেক্সিকো, গুয়াতেমালা, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অর্থ ও ডিজিটাল সম্পদের লেনদেন করত। দেশটির সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্ঠীর একটি অংশের সঙ্গেও তাদের সম্ভাব্য যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে।
ব্রাজিলে মে মাসে পরিচালিত এক অভিযানে চীনা ব্যবসায়ী ও দেশটির একটি শক্তিশালী অপরাধী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত একটি নেটওয়ার্কের সন্ধান পাওয়া যায়। তদন্তকারীদের মতে, ইলেকট্রনিক পণ্য আমদানি, ভুয়া মূল্য দেখিয়ে পণ্য লেনদেন এবং অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাত্র সাত মাসে ১৯০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ পাচার করা হয়েছে।
চিলিতেও এপ্রিল মাসে একটি চীনা বংশোদ্ভূত অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়। তদন্তকারীদের দাবি, ভুয়া প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক হিসাব ও ডিজিটাল মুদ্রার মাধ্যমে তারা ২৫০ মিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থ স্থানান্তর করেছে। এর বড় অংশ আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ প্রতারণা থেকে এসেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অপরাধ ও প্রভাব বিস্তারের যোগসূত্র
বিভিন্ন তদন্তে অবৈধ অর্থের নেটওয়ার্কের সঙ্গে চীনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিমণ্ডলের কিছু ব্যক্তির সম্ভাব্য যোগাযোগের বিষয়টিও উঠে এসেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের কর্তৃপক্ষের কাছে গুরুত্বপূর্ণ অর্থপাচারকারী হিসেবে চিহ্নিত শি ঝি লি চীনা রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অভিজাতদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আর্থিক সেবা দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ ছাড়া চীনা অপরাধজগতের পরিচিত ব্যক্তি ওয়ান কুওক কইয়ের বিরুদ্ধেও মাদক কারবার ও অর্থপাচারসহ আন্তঃদেশীয় অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, এসব ঘটনা অপরাধী নেটওয়ার্ক, অবৈধ অর্থ ও ভূরাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের মধ্যে সম্ভাব্য একটি ধূসর ক্ষেত্র তৈরি করছে। তবে এসব নেটওয়ার্কের সঙ্গে চীনা রাষ্ট্রের সরাসরি সম্পৃক্ততার বিষয়টি প্রমাণিত নয়—এমন সতর্কতাও রয়েছে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তায় নতুন চ্যালেঞ্জ
বিশ্লেষকদের মতে, সংঘবদ্ধ অপরাধের ধরনও বদলে যাচ্ছে। আগে অপরাধী গোষ্ঠীগুলো মূলত নির্দিষ্ট ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দিত। এখন অর্থের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করাই তাদের শক্তির অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠছে।
এই পরিবর্তনের কারণে প্রচলিত আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার মাধ্যমে অপরাধ দমন আরও কঠিন হচ্ছে। শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার বা অবৈধ পণ্য জব্দের পরিবর্তে অর্থের গতিপথ শনাক্ত করা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারগুলোকে আর্থিক গোয়েন্দা সক্ষমতা বাড়ানো, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য বিনিময় জোরদার এবং সাইবার নজরদারি উন্নত করতে হবে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের আইনশৃঙ্খলা ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে সীমান্তপারের সহযোগিতা বাড়ানো জরুরি।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আন্তঃদেশীয় অপরাধীরা যদি সীমান্তের বাধা ছাড়াই কাজ করতে পারে, তাহলে তাদের মোকাবিলায় রাষ্ট্রগুলোকেও একই ধরনের সমন্বিত ও আন্তঃদেশীয় ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
















