কাজাখস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে কাজে লাগিয়ে রাশিয়া দেশটির অভ্যন্তরীণ বিভাজন বাড়ানোর চেষ্টা করছে বলে এক বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। দেশটির বহুমুখী পররাষ্ট্রনীতির কারণে রাশিয়ার প্রভাব কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হওয়ায় মস্কো গণমাধ্যম ও বিভিন্ন বিশ্লেষণমূলক প্রচারের মাধ্যমে চাপ বাড়াচ্ছে বলে এতে উল্লেখ করা হয়।
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আগে কাজাখস্তানের উত্তরাঞ্চলের রুশভাষী জনগোষ্ঠীকে ঘিরে রাশিয়ার গণমাধ্যমে নিরাপত্তা ও অধিকারসংক্রান্ত প্রচার বেশি দেখা গেলেও এখন পশ্চিমাঞ্চলের কাজাখ জনগোষ্ঠীকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ধরনের বয়ান সামনে আনা হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলের বাসিন্দাদের দেশের সবচেয়ে অবহেলিত ও বঞ্চিত জনগোষ্ঠী হিসেবে তুলে ধরে তাদের সঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারের দূরত্ব বাড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
পশ্চিম কাজাখস্তান দেশটির গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী অঞ্চল। অথচ এই অঞ্চল থেকে বিপুল সম্পদ দেশের অন্যান্য অংশে গেলেও স্থানীয় জনগণ তার যথাযথ সুফল পাচ্ছে না—এমন ধারণা বিভিন্ন প্রচারে তুলে ধরা হচ্ছে। এর মাধ্যমে আঞ্চলিক পরিচয়কে জাতীয় পরিচয়ের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে সামাজিক বিভাজন তৈরির চেষ্টা চলছে বলে বিশ্লেষণে বলা হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, পশ্চিমাঞ্চলের জনগোষ্ঠীকে দেশের ক্ষমতার কাঠামো থেকে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত করা হচ্ছে—এমন ধারণাও বিভিন্ন মহলে ছড়ানো হয়েছে। তাদের গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদে যাওয়ার যোগ্যতা নিয়েও নেতিবাচক ধারণা প্রচার করা হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের সম্পর্কে অন্য অঞ্চলে নেতিবাচক সামাজিক ধারণা তৈরি হওয়ার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
এর সঙ্গে অর্থনৈতিক বৈষম্যও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও পশ্চিম কাজাখস্তানের কিছু এলাকায় দারিদ্র্য ও সামাজিক বঞ্চনার মাত্রা তুলনামূলকভাবে বেশি। এসব বাস্তব সমস্যার সমাধানে কেন্দ্রীয় সরকারের পর্যাপ্ত উদ্যোগ না থাকলে তা বাইরের শক্তির জন্য প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, রাশিয়ার গণমাধ্যমে পশ্চিম কাজাখস্তানে বিচ্ছিন্নতাবাদের সম্ভাবনা নিয়ে প্রচার বহু বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে। স্থানীয় শ্রমিকদের আন্দোলন ও সামাজিক অসন্তোষকে কখনো কখনো কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে আঞ্চলিক বিদ্রোহ হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে পশ্চিম কাজাখস্তানের জনগণের মধ্যে প্রকৃত বিচ্ছিন্নতাবাদী রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সুসংগঠিত আন্দোলনের অস্তিত্বের প্রমাণ নেই বলেও বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়ার এই প্রচারের সঙ্গে কাজাখস্তানের জ্বালানি রপ্তানি পথ নিয়েও সম্পর্ক রয়েছে বলে বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে। দেশটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রিত পাইপলাইন ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বিকল্প পথে তেল রপ্তানির চেষ্টা করলে মস্কোর কৌশলগত প্রভাব কমতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক চাপ তৈরির মাধ্যমে কাজাখস্তানকে রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল রাখার চেষ্টা থাকতে পারে বলে এতে বলা হয়েছে।
বিশ্লেষণে আরও বলা হয়, কাজাখস্তান একই সঙ্গে রাশিয়া, পশ্চিমা দেশ ও অন্যান্য শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। কিন্তু রাশিয়ার দৃষ্টিতে প্রতিবেশী দেশটির এই অবস্থান ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাই দেশটির অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও আঞ্চলিক বৈষম্যকে ভবিষ্যতে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হতে পারে।
বিশ্লেষকের মতে, কাজাখস্তানের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু বাইরের প্রচার নয়, বরং দীর্ঘদিনের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও রাজনৈতিক বৈষম্য। এসব সমস্যার সমাধান না হলে বাইরের শক্তি সহজেই বিদ্যমান অসন্তোষকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করতে পারে। ফলে আঞ্চলিক বৈষম্য কমানো, রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানো এবং সব জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা দেশটির নিরাপত্তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
















