লন্ডনের গম্ভীর শরৎসন্ধ্যায় যখন আলো নিভু নিভু, তখনই কেঁপে উঠল বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী গণমাধ্যমগুলোর একটি—বিবিসি। একের পর এক অভিযোগ, পক্ষপাতের তীর, আর অবশেষে নীরব আত্মসমর্পণ—পদত্যাগ করলেন বিবিসির মহাপরিচালক টিম ডেভি ও সংবাদ বিভাগের প্রধান নির্বাহী ডেবোরা টারনেস।
২০২১ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক ভাষণ সম্পাদনা নিয়ে তৈরি ঝড়ই এই পতনের কারণ। অভিযোগ উঠেছে, বিবিসির প্যানোরামা নামের একটি প্রামাণ্যচিত্রে ট্রাম্পের বক্তব্য এমনভাবে সংযোজন করা হয়েছিল, যাতে মনে হয় তিনি সরাসরি উৎসাহ দিয়েছিলেন ক্যাপিটল হিলে দাঙ্গায় অংশ নিতে।
এমন এক সময়েই এই প্রামাণ্যচিত্র সম্প্রচারিত হয়—যখন যুক্তরাষ্ট্র আবারো ভোটের মুখে, ২০২৪ সালের নির্বাচনের ঠিক এক সপ্তাহ আগে। সাবেক উপদেষ্টা মাইকেল প্রেসকটের ফাঁস হওয়া এক নোটে বলা হয়, ট্রাম্পের বক্তৃতার দুটি পৃথক অংশ কেটে জোড়া লাগানো হয়েছিল, যা মূল বক্তব্যের অর্থ সম্পূর্ণ বদলে দেয়।
ট্রাম্প নিজেও রাগ ঝেড়েছেন সোশ্যাল প্ল্যাটফর্ম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ। সেখানে তিনি টিম ডেভি ও ডেবোরা টারনেসকে আখ্যা দিয়েছেন “অসাধু মানুষ” হিসেবে, যারা তার নির্বাচনী ভাগ্যে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করেছেন।
টিম ডেভি তার পদত্যাগপত্রে লিখেছেন, “ভুলের দায় শেষ পর্যন্ত আমারই। বহু বছরের ক্লান্তি, এই অস্থির সময়ের চাপ—সব মিলিয়ে আমি সরে দাঁড়াচ্ছি।”
অন্যদিকে, ডেবোরা টারনেস বলেছেন, “এই বিতর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা প্রিয় প্রতিষ্ঠান বিবিসিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। নেতৃত্ব মানে জবাবদিহি, তাই আমি দায়িত্ব নিচ্ছি এবং বিদায় নিচ্ছি।”
কিন্তু এই ঘটনা শুধু একটি সম্পাদনার ভুলেই থেমে নেই। ফাঁস হওয়া প্রেসকটের নোটে আরও অভিযোগ রয়েছে—বিবিসির ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ, বর্ণবাদ ও ট্রান্সজেন্ডার বিষয়ক প্রতিবেদনে নাকি ছিল একতরফা দৃষ্টিভঙ্গি।
তিনি অভিযোগ করেন, বিবিসি আরবিক সার্ভিস ইসরায়েলবিরোধী পক্ষপাত দেখিয়েছে, আর গাজায় নিহত শিশু ও নারীর সংখ্যা নিয়েও “ভুল উপস্থাপন” করেছে।
অন্যদিকে, কিছু কর্মী আবার অভিযোগ করছেন উল্টো—বিবিসি নাকি ইসরায়েলপন্থী। শতাধিক সাংবাদিকের এক অভ্যন্তরীণ চিঠিতে বলা হয়, সংস্থাটি গাজার বাস্তবতা তুলে ধরতে ব্যর্থ হয়েছে।
একজন সাবেক সাংবাদিক কারিশমা প্যাটেল বলেন, “ট্রাম্পের ভাষণ সম্পাদনার ভুলই যদি শীর্ষকর্তাদের পদত্যাগের কারণ হয়, তাহলে গাজার যন্ত্রণা উপেক্ষা করা অপরাধ ছিল আরও গভীর।”
বিবিসির ইতিহাসে এ প্রথম নয় যে, নিরপেক্ষতার প্রশ্নে প্রতিষ্ঠানটি নড়বড়ে হলো। অতীতে গ্যারি লিনেকারের অভিবাসনবিরোধী নীতির সমালোচনা থেকে শুরু করে যৌন কেলেঙ্কারিতে জড়িয়ে পড়া উপস্থাপক হিউ এডওয়ার্ডস—প্রতিটি ঘটনায় কেঁপে উঠেছে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের আস্থা।
এখন প্রশ্ন—এই সংকটের পর বিবিসির ভবিষ্যৎ কোথায়?
২০২৭ সালে নবায়নের অপেক্ষায় থাকা রয়্যাল চার্টারের আগে এমন কেলেঙ্কারি নিশ্চয়ই অস্বস্তিতে ফেলবে ব্রিটিশ সরকারকেও। দেশটির সংস্কৃতি সচিব লিসা ন্যান্ডি বলেছেন, “এই অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুতর, এবং আমাদের সময় এসেছে বিবিসিকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নিতে।”
আল জাজিরার লন্ডন প্রতিনিধি জনাহ হল মন্তব্য করেছেন, “এটি শুধু দুই ব্যক্তির পদত্যাগ নয়, বরং বিবিসির আত্মার এক পরীক্ষার মুহূর্ত। নিরপেক্ষতার পতাকা ধরে রাখা এখনই সবচেয়ে কঠিন কাজ।”
একসময়ের অটল আস্থা এখন প্রশ্নবিদ্ধ, শব্দের মাঝেই লুকিয়ে আছে সন্দেহের ছায়া। বিবিসি কি আবারও তার বিশ্বাসযোগ্যতার আলো ফিরে পাবে? নাকি এই পদত্যাগই হয়ে থাকবে তার ইতিহাসের এক বেদনাময় অধ্যায়?
















