চার বছরের আপেক্ষিক শান্তির পর আবারও বড় ধরনের সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ইয়েমেন। যোদ্ধা সমাবেশ, সানায় ইরানি বিমানের অবতরণকে ঘিরে উত্তেজনা, বিমানবন্দরে হামলা এবং হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ—সব মিলিয়ে দীর্ঘদিনের ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ পরিস্থিতি ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
জুনের শেষ দিকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকার ও হুথি বিদ্রোহীরা নতুন করে যোদ্ধা সমাবেশ শুরু করে। এরপর ৩ জুলাই এক দশকেরও বেশি সময় পর তেহরান থেকে সানায় সরাসরি একটি ফ্লাইট অবতরণ করে। এর পরদিন হোদেইদাহ প্রদেশে উভয় পক্ষের সংঘর্ষে কয়েক ডজন মানুষ নিহত হয়, যা গত চার বছরের সবচেয়ে প্রাণঘাতী সহিংসতা।
সোমবার আরেকটি ইরানি বিমান সানায় অবতরণের চেষ্টা করলে ইয়েমেন সরকার বিমানবন্দরের রানওয়েতে হামলা চালায়। এর জবাবে হুথিরা সৌদি আরবের দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে। ইয়েমেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী তাহের আল-আকিলি বলেন, সরকারের “ধৈর্যের সীমা শেষ হয়ে গেছে”। অন্যদিকে হুথি মুখপাত্র ইয়াহইয়া সারি ঘোষণা করেন, ইয়েমেনে “উত্তেজনা প্রশমনের অধ্যায় শেষ”।
বিশ্লেষকদের মতে, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের প্রভাব এখন সরাসরি ইয়েমেনে পড়ছে। সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের গবেষক সালাহ আলি সালাহ বলেন, হুথিদের সাম্প্রতিক বক্তব্য শুধু অভ্যন্তরীণ সমর্থন জোগাড়ের জন্য নয়, বরং নতুন যুদ্ধের রাজনৈতিক ও জনমত প্রস্তুতির অংশ। তাঁর মতে, এই সংঘাত শুধু ইয়েমেনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; সৌদি আরব, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং লোহিত সাগরের নৌপথেও এর প্রভাব পড়তে পারে।
হুথিরা অতীতে সৌদি আরব ও লোহিত সাগরের জাহাজ চলাচলে হামলা চালিয়েছে। তবে নতুন করে বড় সংঘাতে জড়ালে তাদেরও বড় ধরনের সামরিক ও রাজনৈতিক মূল্য দিতে হতে পারে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলায় হুথি নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলগুলোও ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
অন্যদিকে ইয়েমেন সরকারও দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। তবে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় বেতন পরিশোধ, সড়ক ও বিমানবন্দর খুলে দেওয়া এবং তেল রপ্তানি পুনরায় চালুর মতো বিভিন্ন শান্তি উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস আরও বেড়েছে।
ইয়েমেনি বিশ্লেষক আদেল দাশেলা মনে করেন, হুথিরা যদি শান্তি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে থাকে, তাহলে সামরিক সংঘাত আবারও বাস্তবে রূপ নিতে পারে। যদিও এর মাত্রা অনেকটাই সৌদি আরবের অবস্থানের ওপর নির্ভর করবে।
এক দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এই যুদ্ধে হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে রয়েছে, ২২ লাখের বেশি শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে এবং প্রায় ২৬ লাখ শিশু বিদ্যালয়ের বাইরে। দীর্ঘস্থায়ী এই অচলাবস্থার অবসান চাইলেও সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা—যে পক্ষই জয়ী হোক, যুদ্ধের দ্রুত অবসান ঘটিয়ে অর্থনীতি ও স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে আনা।
















